দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যস্ততায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক সুন্দর ও কল্যাণকর সুন্নত আমাদের সমাজ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ এসব ছোট ছোট আমল অনুসরণের মাধ্যমে জীবনে যেমন বরকত আনা সম্ভব, তেমনি অপরকে উৎসাহিত করে মিলতে পারে বিপুল সওয়াব। দৈনন্দিন জীবনে উপেক্ষিত এমন ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত তুলে ধরা হলো:
১. ঘুমানোর আগে বিছানা ঝেড়ে নেওয়া
বুখারী ও মুসলিম শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন ঘুমাতে যাবে, সে যেন তার পরনের কাপড়ের আঁচল দিয়ে বিছানা ঝেড়ে নেয়। কারণ সে জানে না যে তার অনুপস্থিতিতে বিছানায় কী এসে পড়েছে। এরপর সে যেন ডান কাতে শুয়ে পড়ে। ইমাম নববীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ক্ষতিকারক কোনো পোকা-মাকড় থেকে হাতকে বাঁচাতে কাপড়ের অংশ দিয়ে বিছানা ঝাড়া উচিত।
২. বাজারে প্রবেশের দোয়া
হাদীসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশের সময় এই দোয়া পড়বে—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ইউহয়ী ওয়া ইয়ুমীতু ওয়া হুয়া হাইয়্যুল লা ইয়ামূতু, বিয়াদিহিল খাইরু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর—আল্লাহ তার আমলনামায় ১০ লাখ সওয়াব লিখে দেন, ১০ লাখ গুনাহ মাফ করেন এবং জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করেন।
পকেটে বা ফোনে এই দোয়াটি রেখে দিলে যেকোনো শপিং মল বা কাঁচাবাজারে প্রবেশের সময় সহজেই তা পাঠ করা সম্ভব।
৩. দুধ পানের পর কুলি করা
নবীজি (সা.) একবার দুধ পানের পর পানি চেয়ে নিয়ে কুলি করলেন এবং বললেন, এর মধ্যে চর্বি রয়েছে। বুখারী ও মুসলিমের এই হাদীসের আলোকে ইমাম নববী বলেন, চর্বিযুক্ত যেকোনো খাবার বা দুধ পানের পর কুলি করা মুস্তাহাব।
৪. পোশাক খোলার সময় দোয়া
কাপড় পরিবর্তনের সময় দোয়া পড়া উচিত।
৫. নামাজে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত থাকা
উসমান ইবনে আবিল আস একবার নবীজিকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, শয়তান আমার নামাজ ও কিরাতের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং আমাকে বিভ্রান্ত করে। নবীজি বললেন, এটি খিনজাব নামের এক শয়তানের কাজ। এমন মনে হলে আউযুবিল্লাহ পড়ে বাম দিকে তিনবার হালকা থুতু ফেলো। সাহাবী বলেন, আমি তা করার পর আল্লাহ আমার সেই সমস্যা দূর করে দেন।
৬. ঘুম থেকে উঠে নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করা
নবীজি বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে জাগবে, সে যেন তিনবার নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করে। কারণ শয়তান রাতের বেলা তার নাকের বাঁশিতে বা ছিদ্রে অবস্থান করে।
৭. নামাজের রুকু ও সেজদার মাঝে তাড়াহুড়ো না করা
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) রুকু থেকে মাথা সোজা করে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে মনে হতো তিনি পরবর্তী সেজদার কথা ভুলে গেছেন। একইভাবে দুই সেজদার মাঝখানেও তিনি দীর্ঘ সময় বসে রব্বিগফিরলী রব্বিগফিরলী বলে দোয়া করতেন। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, সাহাবীদের যুগের পর এই সুন্নহ অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন।
৮. নামাজের সামনে সুতরা রাখা
নবীজি বলেছেন, নামাজের সময় সামনে উঁচু কোনো বস্তু বা আড়াল রাখা উচিত, যাতে সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেও নামাজের ক্ষতি না হয়। এই আড়ালকে সুতরা বলা হয়, যা একটি দেয়াল, লাঠি বা হ্যান্ডব্যাগও হতে পারে।
৯. জুতো পরার নিয়ম
জুতা বা স্যান্ডেল পরার সময় ডান পা দিয়ে শুরু করা এবং খোলার সময় বাম পা দিয়ে শুরু করা সুন্নত। জুতা পরলে দুটিই পরা উচিত এবং খালি পায়ে হাঁটলে দুটি পা-ই খালি রাখা উচিত।
১০. খাবারের সমালোচনা না করা
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো খাবারের ত্রুটি ধরতেন না। পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে না খেয়ে হাত গুটিয়ে নিতেন। অথচ আমরা প্রায়শই খাবারের স্বাদ নিয়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করে থাকি।
১১. তিনবার অনুমতি চাওয়া
কোনো বাড়িতে বা কারো ঘরে প্রবেশের জন্য সর্বোচ্চ তিনবার অনুমতি নেওয়া বা নক করা সুন্নাহ। উত্তর না মিললে ফিরে আসতে বলা হয়েছে। বর্তমান যুগে মোবাইল ফোনে কল করার ক্ষেত্রেও ইসলামিক স্কলাররা এই নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দেন। সর্বোচ্চ তিনবার কল করে সাড়া না পেলে আর বিরক্ত করা উচিত নয়।
১২. হাই তোলার সময় মুখ চেপে ধরা
নবীজি বলেছেন, হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। তোমাদের কারো হাই আসলে সে যেন তা যথাসম্ভব চেপে রাখে বা মুখে হাত দেয়। কারণ হাই তোলার সময় হা বা আহ শব্দ করলে শয়তান হাসে।
১৩. উটের মতো এক নিঃশ্বাসে পানি পান না করা
নবীজি এক নিঃশ্বাসে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বসে, অন্তত দুই বা তিন বারে, শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলে পানি পানের নির্দেশ দিয়েছেন।
এসি/আপ্র/০৯/০৬/২০২৬