প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন কীসে, জালিয়াতিতে। সব জিনিস জাল, বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না, ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয় পত্রিকায় দেখেছেন, ‘আমেরিকান বেস অব জাল’ এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানিয়েছি আমরা।’
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে চার দিনের ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ একটা বিষয়ে পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন, এখন আপনাদের সবার জানা আছে হয়তো, তবুও আমি আবার বলবো। বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন কীসে, জালিয়াতিতে। সব জিনিস জাল, বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না, ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। আপনারা নিশ্চয় পত্রিকায় দেখেছেন- ‘আমেরিকান বেস অব জাল’ এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানিয়েছি আমরা। আমাদের বুদ্ধি আছে, না হলে করতে পারতাম না। কিন্তু খারাপ কাজে লাগাচ্ছে। যে জালিয়াতি করতে জানে, তার আছে অনেক ক্রিয়েটিভিটি। আমি মধ্যপ্রাচ্যের একটা রাষ্ট্রের মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করছিলাম, তারা বহুদিন ধরে আমাদেরকে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। বাংলাদেশি কোনো মানুষকে প্রবেশের অধিকার দেবে না। এমনকি আমি যেটা তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করার জন্য, সর্বনিম্ন আমাদের যে মেরিনার, যারা জাহাজ চালান, দুনিয়াতে প্রাউড অব লিডিং ইন্ডাস্ট্রি, তারা জাহাজ চালান দুনিয়াতে। তারা এক বন্দর থেকে আরেক বন্দর, সেই তাদেরকে ওই দেশের বন্দরে যখন জাহাজ আসে, তখন কয়দিনের জন্য তারা ছুটি পান শহরে গিয়ে একটু ঘোরাফেরা করেন, আসা-যাওয়া করতে পারেন। জাহাজ ছেড়ে স্থলে আসতে পারেন। তারা বাংলাদেশি নাগরিক হলে ওই দেশে তাকে নামতে দেওয়া হয় না। আমি শুধু মিনতি জানালাম যে, বেচারারা জাহাজে জাহাজে ঘুরেন, অন্তত তাদের জন্য একটা পারমিশন দাও। তিনি (মন্ত্রী) বলছেন, আমাদের নিয়ম তো সবার জন্য প্রযোজ্য, আমরা কী করি! আমি বললাম— তুমি আমার আবেদনটা গ্রহণ করো, শুধু তাদের জন্য দাও, আর যদি মনে করো। তো কয়েক মাস পরে শুনলাম যে, তারা মেরিনারদের পারমিশন দিয়েছে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশিরা রিজেক্টেড হয়ে যাচ্ছে কেন? নানাজনের কাগজপত্র দেখলাম, শিক্ষার সার্টিফিকেট ভুল, জালিয়াত বলছে। একজন নারী যিনি আসছেন ডাক্তার হয়ে, তার ভিসা হলো ডাক্তারের ভিসা। আমি দেখেই বুঝলাম— ডাক্তার হবার তার কোনো ক্ষমতা নাই। তার চেহারায় বলে না ডাক্তারের কিছু আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোন মেডিক্যাল থেকে পাস করেছেন? তখন কাগজপত্র ঘেঁটে একজনে বের করে দিলো মেডিক্যাল সার্টিফিকেট। তো স্টাফরা বলেন, স্যার এটা জাল, ভুয়া। বাকি সব সার্টিফিকেট তার জাল। তিনি বললেন, আমার অ্যাসেসমেন্টে সুবোধ কাজ, ঢুকতে পারমিশন দিলে তিনি গৃহকর্মী হবেন। কিন্তু নিয়ে এসেছেন ডাক্তারের সার্টিফিকেট। কী হবে আমাদের! এই প্রযুক্তির কথা বলছি যে, এই প্রযুক্তি তিনি জালিয়াতির কাজে লাগাবেন, যদি না আমরা আগের থেকে নিজেদের সংশোধন করি। হাজারে হাজারে মানুষ নানা ভুয়া সব পারমিশন, ভুয়া ব্যাংক সার্টিফিকেট এবং আমরা ইস্যু করছি। সেগুলো এবং জেনুইনলি ইস্যু করছি। যেখান থেকে যাবার কথা সেখান থেকে ইস্যু করছি। কাজেই আমাদেরকে প্রযুক্তিতে আসতে হলে ন্যায্য জিনিস নিয়ে আসতে হবে। এদেশ জালিয়াতের কারখানা হবে না, এটাকে আমরা করতে চাই না। আমরা নিজ গুণে দেশে, সারা দুনিয়াতে মাথা উঁচু করে চলতে চাই এবং সেই সামর্থ্য আমাদের আছে।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। যার নেতৃত্বে ছিল তরুণরা। এই তরুণরাই নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে, শুধু বাংলাদেশ নয়— তারা গোটা বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। তাদের কোনোটাতে ঘাটতি নাই। আমরা শুধু টেনে রাখছি তাদেরকে। তাদেরকে ছেড়ে দিলে তারা ঘুড়ির মতো উড়ে বেড়াবে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আগেকার প্রজন্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা দেখতে একরকম, কথা বলি একরকম, মানুষ আমরা ভিন্ন। তারা আমাকে অনেক পেছনে ফেলে চলে গেছে। যেহেতু আমি এত কম স্পিডে হাঁটি, সে আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। সে বিরক্ত হয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আজকের তরুণরা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে শক্তিশালী প্রজন্ম। এটা বিশ্বব্যাপী যেসব প্রজন্ম, এটা পৃথিবীর ইতিহাসে এত শক্তিশালী প্রজন্ম আর হয় নাই। এমন শক্তিশালী তারা কি সর্বকালের শক্তিশালী, না সর্বকালের সর্বশক্তি শক্তিশালী না— এর পরের প্রজন্ম এর থেকে আরও বেশি শক্তিশালী হবে। এই দুই প্রজন্মের মুখ দেখাদেখি হবে না, এভাবে এটা চলবে। এই শক্তিটাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি। তাকে রিকগনাইজ করতে পারছি না। তাকে রিকগনিশন দিলে সে এগিয়ে আসতে পারতো, কাজটা করতে পারতো। এই যে পরিবর্তন, এই যে শক্তিশালী হয়েছে— তার এসেন্সটা হলো প্রযুক্তি। ওর কারণেই সে ভিন্ন, সে আমার ছেলে আমার মেয়ে, কিন্তু ওই যে বললাম, তার কাছে আমি গুহাবাসী, যেহেতু তার কাছে ওই শক্তি আলাদিনের চেরাগ, তার হাতে এই আলাদিনের চেরাগ দিয়ে— সে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, গত অভ্যুত্থানের একটা কথা স্মরণ করছি, সবাই এর সঙ্গে পরিচিত। ইন্টারনেট যখন বন্ধ করে দেওয়া হলো, সব তরুণ সারা দেশে বিক্ষুব্ধ হয়ে গেছে। সে বিক্ষোভের পরিমাণ এত ছিল, তারা ফুটন্ত তেলের মতো টগবগ ছিল। কী হয়েছে? ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। এখন বুঝতে পারেন ইন্টারনেটটা তার প্রাণের কত প্রিয় জিনিস। এটা সহ্য করতে পারছে না। এমন টগবগ করলো এই উত্তেজনায় শেষ পর্যন্ত একটা মহাশক্তিশালী একটা সরকারকে পালাতে হলো। এই ইন্টারনেট বন্ধ তার একটা বড় ভূমিকা রেখেছিল।
এসি/আপ্র/২৮/০১/২০২৬