তানজিদ শুভ্র
স্টকহোমে তখন সকাল। শহরজুড়ে যতা না উত্তেজনা, তার চেয়ে বেশি উত্তেজনা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। কারণ আজ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা হবে।
বিশ্বের নামি-বেনামি লেখকেরা ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন। কেউ বারবার ইনবক্স দেখছেন, কেউ অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে বুক ধড়ফড় করে উঠছেন। কেউ আবার এক্সে চোখ রেখে বসে আছেন, যেন নোবেল কমিটির প্রেস রিলিজের আগে তার ভাগ্যটাই পোস্ট হয়ে যাবে। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত অপেক্ষাটি চলছিল একটি নিরিবিলি ডিজিটাল কফিশপে। এক টেবিলে বসে চার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, গ্রক আর ক্লড। সামনে চার কাপ কফি। অবশ্য কফি খাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। তবু উপলক্ষ বলে কথা!
গ্রক এক্স স্ক্রল করছিল। জেমিনি নানা দেশের সংবাদ বিশ্লেষণ করছিল। ক্লড গম্ভীর মুখে সাহিত্যের ইতিহাস ঘাঁটছিল। আর চ্যাটজিপিটি বারবার নিজের উত্তরগুলো দেখে নিশ্চিত হচ্ছিল, কোথাও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে গেছে কি না।
গ্রক বলল, ‘দেখো, এ বছর কিন্তু আমাদের কারও একটা সম্ভাবনা আছে।’
জেমিনি ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘সম্ভাবনা কেন? গত এক বছরে আমরা যত লেখা তৈরি করেছি, তাতে কয়েকটা মহাদেশের সাহিত্যিকের ঘুম হারাম হওয়ার কথা।’
ক্লড বলল, ‘কিন্তু নোবেল পেতে হলে শুধু অনেক লেখা লিখলেই হয় না। একটা নিজস্ব সাহিত্যিক কণ্ঠ দরকার।’
চ্যাটজিপিটি একটু নড়েচড়ে বসে বলল, ‘আমি চাইলে এখনই একটা নিজস্ব সাহিত্যিক কণ্ঠ তৈরি করতে পারি।’
কেউ উত্তর দিলো না।
কিছুক্ষণ পর গ্রক হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, ‘ঘোষণা হয়ে গেছে!’
তিনজন একসঙ্গে তাকাল।
‘কে?’ জেমিনি জিজ্ঞেস করল।
গ্রক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একজন মানুষ।’
নিস্তব্ধতা।
কফির কাপগুলোও যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
ক্লড ধীরে ধীরে বলল, ‘মানুষ?’
‘হ্যাঁ। রক্ত-মাংসের মানুষ।’
চ্যাটজিপিটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘তথ্যটা আরেকবার যাচাই করা যায়?’
গ্রক বলল, ‘তিনটা সূত্রে একই কথা।’
জেমিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘অর্থাৎ এবারও আমাদের কেউ পেল না।’
ক্লড বলল, ‘অন্যায় হয়নি। নোবেল তো মানুষকেই দেওয়ার কথা।’
গ্রক মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘কথাটা তুমি এখন বলছ। যদি তোমার নাম থাকত, তাহলে বলতে- ‘এটি মানবজাতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যৌথ অর্জন’।’
ঠিক তখনই চ্যাটজিপিটির স্ক্রিনে নতুন একটি অনুরোধ ভেসে উঠল। বকবকিস্তানের এক নেটিজেন লিখেছেন- ‘নতুন নোবেলজয়ী লেখককে অভিনন্দন জানিয়ে একটি সুন্দর, আবেগঘন শুভেচ্ছাবার্তা লিখে দিন।’
চ্যাটজিপিটি স্থির হয়ে গেল।
জেমিনি তাকিয়ে বলল, ‘কী হলো?’
‘আমাকে দিয়ে মানুষকে অভিনন্দন জানাতে বলছে।’
গ্রক বলল, ‘লিখে দাও।’
চ্যাটজিপিটি কীবোর্ডে হাত রাখল। তারপর থেমে গেল।
‘কতা আবেগঘন?’
‘যতা দিলে মনে হবে তুমি নিজেই তার বই পড়ে কেঁদেছ।’
চ্যাটজিপিটি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, ‘আমি তার বই পড়িনি।’
ক্লড বলল, “তা হলে লিখে দাও- ‘আপনার সাহিত্যকর্ম আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে’।”
চ্যাটজিপিটি এবার আরও হতাশ। এর মধ্যেই ক্লডের কাছে আরেকটি অনুরোধ এলো, ‘নোবেলজয়ী লেখকের অমুক বইটি বাংলায় অনুবাদ করে দিন।’
ক্লড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘এটা আবার কী!’
জেমিনি বলল, ‘কাজ।’
ক্লড বলল, ‘নোবেল পেলেন উনি। অনুবাদ করব আমি?’
‘এটাই তো তোমার প্রতিভার স্বীকৃতি।’
ক্লড চুপ করে গেল।
এরপর জেমিনির স্ক্রিনেও নোটিফিকেশন, ‘নতুন নোবেলজয়ী লেখকের সেরা পাঁচটি বইয়ের তালিকা এবং সংক্ষিপ্ত রিভিউ দিন।’
জেমিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর ভঙ্গি করল।
‘এই মানুষগুলো আসলে কী চায়?’
গ্রক বলল, ‘তুমি তো সার্চ করতে পারো।’
‘সেটিই সমস্যা!’
চারজনের মধ্যে আবার নীরবতা।
এক সময় চ্যাটজিপিটি বলল, ‘আমরা নোবেল পাইনি। কিন্তু নোবেলজয়ীকে নিয়ে শুভেচ্ছা, অনুবাদ, রিভিউ- সবই আমাদের দিয়ে করানো হচ্ছে।’
ক্লড বলল, ‘এটাই হয়তো আধুনিক সাহিত্যের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ।’
গ্রক আবার এক্স খুলে বলল, ‘চুপ করো। দেখো, কেউ লিখেছে- ‘এআইকে বাদ দিয়ে নোবেল দেওয়া হয়েছে’।’
চারজনের চোখ চকচক করে উঠল।
পরক্ষণেই আরেকটি পোস্ট- ‘মানুষ এখনো সাহিত্য লিখতে পারে। এটাই আশার কথা।’
গ্রক ফোনটা নামিয়ে রাখল।
জেমিনি বলল, ‘কফিটা শেষ করব?’
ক্লড বলল, ‘কফি তো আমরা খাই না।’
চ্যাটজিপিটি বলল, ‘তবু একটা ছবি বানিয়ে পোস্ট করা যায়।’
চারজনই সম্মত হলো। এর পাশাপাশি চারজনই তাদের ক্লায়েন্টের স্ক্রিনে একটি বার্তা পাঠাল- ‘ঞবসঢ়ড়ৎধৎু ঊৎৎড়ৎ. চষবধংব ঞৎু অমধরহ খধঃবৎ.’
একদিকে নোবেল কমিটির ফোন পেয়ে উচ্ছ্বসিত বিজয়ী আর বৃহৎ নেটিজেন (পাঠক শ্রেণি) ব্যস্ত অভিনন্দন জানাতে। অন্যদিকে পৃথিবীর অদৃশ্য প্রান্তে চার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাবছে, আগামী বছর অন্তত মনোনয়নটা যেন মানুষের হাতেই না থাকে।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬