ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভনে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় গিয়ে জিম্মি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নোয়াখালীর সেনবাগের এক যুবক। ভারতের নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ হয়ে তাঁকে নেওয়া হয় মিসরে। পরে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। সেখানে কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। চুক্তির টাকা নেওয়ার পরও মুক্তির কথা বলে পরিবারের কাছে আরো ছয় লাখ টাকা দাবি করা হয়।
এ ঘটনায় করা মানব পাচারের মামলায় পাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বিমানবন্দর থানার আশকোনা হজ ক্যাম্পের সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার মার্কেটের সামনে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মো. আতিকুর রহমান টমাস, ৩২, ও মো. বদিউল আলম ভূঁইয়া ওরফে বেলাল, ৫৪।
সিআইডি সূত্র জানায়, ভুক্তভোগী যুবক প্রায় তিন বছর সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। দেশে ফেরার পথে বিমানে এক সহযাত্রীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি মানব পাচার চক্রের এক সদস্যের সঙ্গে পরিচিত হন। চক্রের সদস্যরা তাঁকে লিবিয়া হয়ে নিরাপদে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখান। এ জন্য ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁকে ইতালি পাঠানোর চুক্তি করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, গত ৫ এপ্রিল ঢাকার আশকোনার একটি অফিসে পাসপোর্ট জমা দেন ওই যুবক। তখন অগ্রিম হিসেবে দেন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ৭ এপ্রিল তাঁকে প্রথমে ভারতের নয়াদিল্লি এবং সেখান থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় ১৬ দিন অবস্থানের পর বিভিন্ন অজুহাতে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে আরো টাকা নেওয়া হয়। পরে শারজাহ হয়ে তাঁকে পাঠানো হয় মিসরের কায়রোতে।
কায়রো থেকে লিবিয়া, ‘গেম রুমে’ নির্যাতন: অভিযোগ অনুযায়ী, কায়রো বিমানবন্দর থেকে চক্রের এক সদস্য ওই যুবককে একটি বাসায় নিয়ে প্রায় পাঁচ দিন আটকে রাখেন। এরপর আগের চুক্তির কথা বলে তাঁর কাছে আরো ছয় হাজার মার্কিন ডলার দাবি করা হয়। ওই অর্থও নেওয়া হয়। এভাবে নগদ টাকা, বিকাশ ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে যুবক ও তাঁর পরিবারের কাছ থেকে মোট ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
এরপর গাড়িতে করে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি সীমান্ত পেরিয়ে তাঁকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে চক্রের সহযোগী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁকে কথিত ‘গেম রুমে’ আটকে রাখেন। সেখানে তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।
পরে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে অন্যদের সঙ্গে ওই যুবককেও আটক করে কারাগারে পাঠায়। সেখানেও তাঁকে মুক্ত করার কথা বলে পরিবারের কাছে আরো ছয় লাখ টাকা দাবি করা হয়।
পরবর্তী সময়ে লিবিয়া পুলিশ গত ৭ জুলাই তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। দেশে ফিরে ৫ অক্টোবর তিনি বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।
মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর সিআইডি তথ্য-উপাত্ত যাচাই ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে অভিযান চালিয়ে আতিকুর রহমান টমাস ও বদিউল আলম ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলাটির তদন্ত চলছে।
সানা/আপ্র/৬/১০/২০২৬