বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি: রংপুরের বদরগঞ্জের চাঁদকুঠি গ্রামে এক যুবক ও এক গৃহবধূকে আপত্তিকর অবস্থায় আটকের অভিযোগ তুলে একই দড়িতে বেঁধে নির্যাতন, সেই দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এবং পরে উভয় পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে ঘটনাটি অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ হিসেবে সামনে এলেও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে রাজনৈতিক বিরোধ, পারিবারিক পূর্বশত্রুতা, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর দাবিও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) কারাফটকে সাক্ষাৎকার কক্ষে আটক ছাত্রলীগ নেতা ফুলবাবু দাবি করেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ষড়যন্ত্রের শিকার। তাঁর ভাষ্য, তিনি নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতেন এবং এ কারণে ঘর, গ্রাম এমনকি শহরও ছাড়তে হয়েছে।
ফুলবাবু বলেন, তাঁর দুঃখের একটি ভিডিও ‘ভয়েস বাংলা’য় প্রচার হওয়ার পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন একটি চক্র তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং তাঁকে ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা করে।
ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, চাঁদকুঠি গ্রামে ওই গৃহবধূর বাড়িতে নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে বের হওয়ার পর একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাঁকে জোর করে আবার ওই বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে গৃহবধূসহ তাঁকে একই দড়িতে বেঁধে নির্যাতন করা হয় এবং সেই দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ফুলবাবুর দাবি, চাঁদাবাজ যুবকদের দেওয়া মোটা অঙ্কের অর্থের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁর বিরুদ্ধে এ অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো প্রমাণ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন: ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবার। তাদের অভিযোগ, একটি মুঠোফোনের মাধ্যমে গৃহবধূকে বাদী করে মামলা করা হয়েছে এবং ফুলবাবুকে এককভাবে আসামি হিসেবে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পরিবারের দাবি, ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে অভিযুক্ত যুবকেরা মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করেছিল। একই সঙ্গে গৃহবধূ যাতে নিজ ভিটায় ফিরতে না পারেন, সে জন্য জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন যুবক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, তাঁরা দুজনকে ঘরের ভেতর আপত্তিকর অবস্থায় আটক করেছিলেন এবং দুজনেরই আইনগত শাস্তি চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ একজনকে ছেড়ে দিয়ে আরেকজনকে আদালতে পাঠানোয় তাঁরা নিজেরাই বিস্মিত হয়েছেন বলে দাবি করেন তাঁরা।
ওই যুবকেরা আরো দাবি করেন, ওই গৃহবধূর বিরুদ্ধে এলাকায় আগে থেকেই একাধিক অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁর আচরণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ছিল।
‘হামলা ও লুটপাটের বিচার চাই’: গৃহবধূর পরিবারের পক্ষ থেকে শারীরিক নির্যাতন ও বাড়িঘরে লুটপাটের বিচার দাবি করা হয়েছে। গৃহবধূর ভাই হাফিজুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, তাঁর বোন কোনো অপরাধ করলে আইনগত শাস্তি হোক, এতে তাঁদের আপত্তি নেই। কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ ঘটনা সম্পর্কে জানার আগেই বাইরের পাঠানপাড়ার লোকজন কীভাবে সেখানে গিয়ে হামলা চালাল, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
হাফিজুর রহমানের অভিযোগ, হামলা ও বাড়িঘর লুটপাটের কোনো দৃশ্য না দেখিয়ে শুধু দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে।
গৃহবধূর মেয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁর মায়ের ওপর নির্যাতন ও তাঁদের বাড়িঘর লুটপাটের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ভয়ে তাঁরা থানায় গিয়ে পাল্টা মামলা করার সাহস পাচ্ছেন না। থানায় গেলে নতুন মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে আটক ফুলবাবুর বাবা মনজুরুল ইসলামও ঘটনাটিকে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, চক্রান্তকারীরা পুলিশকে বিভ্রান্ত করে তাঁর ছেলেকে এককভাবে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এ ঘটনায় ছিনতাই হওয়া দুটি মুঠোফোন তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, যুবক ও গৃহবধূকে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা, বাড়িঘর লুটপাট, অর্থ দাবির অভিযোগ এবং পুলিশের ভূমিকা-সবকিছুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে দুই পরিবার। একই সঙ্গে উচ্চপদস্থ পুলিশ প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তারা।
সানা/আপ্র/৩০/৯/২০২৬