গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

স্বৈরাচারের পতন হলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি: মতিউর রহমান

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:৪০ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০১:৪৫ এএম ২০২৬
স্বৈরাচারের পতন হলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি: মতিউর রহমান
ছবি

বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের দ্বিতীয় দিনে রোববার বিকেলে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক নির্ধারিত বক্তৃতা দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান -ছবি সংগৃহীত

গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের পতন হলেও দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার ৬৪ বছর পরও তাকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবিতে কথা বলতে হচ্ছে।

রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের দ্বিতীয় দিনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক নির্ধারিত বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের আয়োজনে তিন দিনের এ আন্তর্জাতিক সম্মেলন সোমবার শেষ হওয়ার কথা।

বক্তৃতার শুরুতে মতিউর রহমান ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির স্মৃতিচারণ করেন। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছিল। সে সময়ের দাবিগুলোর মধ্যে কথা বলার অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও ছিল।

মতিউর রহমান বলেন, তিনি ওই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। এরপর বহু আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও মূল বিষয়গুলো একই জায়গায় রয়ে গেছে। এখনো সেই দাবিতে কথা বলতে হচ্ছে বলেও তিনি আক্ষেপ করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যম
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের পতনকে অবিশ্বাস্য ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন মতিউর রহমান। তবে তার মতে, প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশবাসীকে অনেকটা হতাশ করেছে। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের কিছু উদ্যোগ বেশি দূর এগোয়নি এবং কোনো কোনো কমিশনের প্রস্তাবও বাস্তবায়িত হয়নি।

ওই সময় গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন ছিল বলে দাবি করেন তিনি। নানা চাপ ও ভয়ের মুখে অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মালিকানা বদলেছে, অনেক সম্পাদকের জায়গায় নতুন কেউ এসেছেন এবং অনেক সাংবাদিককে কাজ ছাড়তে হয়েছে বলে জানান তিনি।

নিজেদের প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মতিউর রহমান বলেন, পুরো সময় ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকি ছিল। দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশ থেকে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার চালানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে প্রায় সাত দিন বিক্ষিপ্ত সমাবেশ এবং ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রায় সারা রাত কার্যালয়ে আগুন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তার অভিযোগ, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সময়মতো এবং যথেষ্ট শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসেনি। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও তাদের সরাসরি কঠোর নির্দেশ দেননি। পরে দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ও অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয় বলে তিনি জানান।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, কমিশনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাব নিয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক ও পরিচালকদের মধ্যে ইতিবাচক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকার সেগুলো বাস্তবায়নে ‘সামান্যতম’ উদ্যোগও নেয়নি।


শেখ হাসিনার আমলের অভিজ্ঞতা
শেখ হাসিনার শাসনামলে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ সংকুচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন মতিউর রহমান। তার ভাষ্য, সাংবাদিক ও সম্পাদকদের জেলে যেতে হয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। প্রথম আলোর প্রচারসংখ্যা কমানোর চেষ্টা এবং সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।

তার দাবি, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫০টি দেশি-বিদেশি বড় কোম্পানির বিজ্ঞাপনও বন্ধ করা হয়েছিল। প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা প্রায় ৮০-তে পৌঁছেছিল বলেও তিনি জানান।

মতিউর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রথম আলোর মালিকানা ছেড়ে দিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। তার দাবি, উদ্দেশ্য ছিল সম্পাদককে সরিয়ে মালিকানা একটি অর্থ পাচারকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া এবং এসব শেখ হাসিনার নির্দেশেই হয়েছিল।

বিএনপি সরকারের কাছে সংস্কারের প্রত্যাশা
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রায় ১৯ বছর পর বিএনপি ক্ষমতায় আসার বিষয়টি উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬ সালে বিএনপির দুই মেয়াদে তিনি প্রথমে ভোরের কাগজ এবং পরে প্রথম আলোর সম্পাদক ছিলেন। তখন সরকারের অনেক নীতির কঠোর সমালোচনা করেও কোনো হয়রানি বা আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হয়নি বলে জানান তিনি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে তর্ক এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তর্কের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।

বর্তমান সরকারের কাছে গণমাধ্যম সংস্কারের প্রত্যাশা তুলে ধরে মতিউর রহমান বলেন, বিএনপির ৩১ দফার ১১ নম্বর দফায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে মিডিয়া কমিশন গঠনের কথা রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারেও নির্ভীক সাংবাদিকতার সুরক্ষা এবং সাংবাদিক নির্যাতনবিরোধী বিশেষ সেল গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে এ বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

তবে প্রতিশ্রুতির পরও সংস্কারে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন মতিউর রহমান। মিডিয়া কমিশন গঠন নিয়ে একটি মতবিনিময় সভার পর আর কোনো অগ্রগতির কথা শোনা যায়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও পুরোনো বিল পরিশোধেও অগ্রগতি নেই বলে তিনি দাবি করেন।

কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। কোনো কোনো সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অনিশ্চয়তা ও চাপের কথা বলছেন এবং সংবাদ ও মতামত প্রকাশে অনেক ক্ষেত্রে স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কিছু প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বক্তব্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মতিউর রহমান বলেন, সরকার মাত্র সাত মাস পার করেছে এবং সামনে অনেক সময় রয়েছে। তাই সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যমের জরুরি সংস্কারের কাজ এখনই শুরু করা প্রয়োজন। তা না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশ পিছিয়ে পড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শেষে ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সেই দাবির কথা আবারও স্মরণ করে তিনি বলেন, সেদিন তারা কথা বলার অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবি তুলেছিলেন। বহু আন্দোলন ও সংগ্রামের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বারবার পরিবর্তিত হলেও মূল বিষয়গুলো এখনো স্থবির হয়ে আছে। সেই কারণে এখনো একই দাবিতে কথা বলতে ও দাবি জানাতে হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সানা/আপ্র/৫/১০/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা, আহত ১০
০৫ অক্টোবর ২০২৬

রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা, আহত ১০

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্য...

মৃগী নদীতে ঝাঁপ, ২৬ ঘণ্টা পর মিললো শিক্ষার্থীর লাশ
০৫ অক্টোবর ২০২৬

মৃগী নদীতে ঝাঁপ, ২৬ ঘণ্টা পর মিললো শিক্ষার্থীর লাশ

শেরপুর সদর উপজেলায় নিখোঁজের প্রায় ২৬ ঘণ্টা পর মৃগী নদী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সৈয়দ সাদমান জয়...

নকল ঘি বিক্রির দায়ে প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা
০৪ অক্টোবর ২০২৬

নকল ঘি বিক্রির দায়ে প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা

চট্টগ্রাম মহানগরীতে নকল ঘি বিক্রির দায়ে এম আর কনজিউমারস প্রোডাক্টসকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ...

বিরোধপূর্ণ জমির ঘরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু
০৪ অক্টোবর ২০২৬

বিরোধপূর্ণ জমির ঘরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু

উপজেলা প্রতিনিধি, শ্রীপুর (গাজীপুর): গাজীপুরের শ্রীপুরে বিরোধপূর্ণ জমির একটি তালাবদ্ধ জরাজীর্ণ ঘরে অ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আদালতে হেলমেট ছুড়ে আখতারুজ্জামান বললেন, কেন পরব

রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে নেওয়ার সময় মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক আপনি কি মনে করেন তিনি সঠিক প্রশ্ন করেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে