বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার সাতক্ষীরার উপকূলীয় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সরকারি আইন ও বিধিবিধান উপেক্ষা করে গড়ে উঠেছে একাধিক পর্যটনকেন্দ্র। পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধ অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত এসব রিসোর্টের বিরুদ্ধে এবার কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে না নিলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান এবং নিয়মিত মামলা করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আইনি প্রক্রিয়ার মুখে থাকা এবং বন্ধের নির্দেশ পাওয়া শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকার চারটি রিসোর্ট হলো বর্ষা, ওশান প্যারাডাইজ, সুশীলন ও প্রসাদ প্যারাডাইজ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও এর সংলগ্ন নাজুক বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) পরিচালিত অবৈধ রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে আগেই অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২০ নভেম্বর পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং অননুমোদিত বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণের দায়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও সতর্কীকরণ নোটিশ জারি করে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর।
বিভাগীয় নির্দেশনার পর সাতক্ষীরা অংশে অবৈধ পর্যটন ব্যবসা উচ্ছেদে চূড়ান্ত অভিযানের পরিকল্পনা নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়।
দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি
পরিবেশ অধিদপ্তর সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সোমেন মৈত্র বলেন, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার সংবেদনশীলতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। অথচ চারটি রিসোর্ট দীর্ঘদিন ধরে বৈধ অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, আগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। পরিবেশ আইন অমান্য করে কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় এবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ
সুন্দরবনকে ঘিরে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবসা ও অনুমোদনহীন বাণিজ্যিক অবকাঠামোর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারাও।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জে ডি এম হাছানুর রহমান বলেন, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন বিভাগের আওতাধীন সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে নির্মিত হওয়ায় বন বিভাগের সরাসরি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার আইনি সুযোগ সীমিত।
তবে এসব রিসোর্ট থেকে সংরক্ষিত বনের গভীরে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেম বাজানো, রাতভর তীব্র আলো ব্যবহার এবং প্লাস্টিকসহ ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলার কারণে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র চরম হুমকির মুখে পড়ছে বলে তিনি জানান।
পরিবেশকর্মীদের কঠোর পদক্ষেপের দাবি
সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অবৈধ রিসোর্ট ও বেপরোয়া পর্যটন প্রসঙ্গে কোস্টাল ভয়েস ফর এগ্রো-ইকোলজি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (সিভিএই) প্রধান নির্বাহী ও পরিবেশকর্মী আশেক ই-ইলাহী বলেন, সুন্দরবন শুধু জাতীয় সম্পদ নয়, এটি উপকূলীয় জীবন ও প্রকৃতির রক্ষাকবচ। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো সুন্দরবনের নাজুক বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। শব্দদূষণ, বর্জ্য ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা অপূরণীয়।
তিনি বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু সতর্কীকরণ নোটিশ যথেষ্ট নয়। অননুমোদিত রিসোর্টগুলো অবিলম্বে উচ্ছেদ করে পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটননীতি নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্লাস্টিক দূষণ ও নর্দমার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি বনের খাল ও নদীতে গিয়ে পড়ায় ম্যানগ্রোভের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাঁদের আশঙ্কা, পরিবেশগত ছাড়পত্রহীন রিসোর্ট দ্রুত উচ্ছেদ, পরিবেশবান্ধব পর্যটননীতি বাস্তবায়ন এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে উপকূলীয় অঞ্চলের এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও উপকূলের পরিবেশ রক্ষায় তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
সানা/আপ্র/১০/১০/২০২৬