পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিত করতে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়। একই সঙ্গে ভেজাল ও প্রতারণা রোধ, ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং নিরাপদ ও টেকসই বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আলোচকরা।
বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে বুধবার (১৪ অক্টোবর) চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠ এলাকায় বিএসটিআইয়ের বিভাগীয় কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘উন্নত বিশ্বের জন্য অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি: সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইটি পরিচালক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, পণ্যের মান বজায় রাখা শুধু ব্যবসায়িক সুবিধা বাড়ায় না, পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই অর্থনীতি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সপ্তম অভীষ্ট অনুযায়ী সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের শক্তির সমন্বয় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তার মতে, সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে যথাযথ মান বজায় না থাকলে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার অগ্রগতি থাকলেও ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য অর্জনে উন্নত মাননিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের সোলার মডিউল ও ইনভার্টার পরীক্ষাগারের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে মানভিত্তিক শিল্পায়ন জরুরি। মান থেকেই টেকসই উন্নয়নের শুরু।
সভাপতির বক্তব্যে বিএসটিআই চট্টগ্রামের কার্যালয়প্রধান ও উপপরিচালক (মেট্রোলজি) মো. মোমেন উস সাজ্জাদ বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য এবং পণ্যের গুণগতমান রক্ষা ও তদারকিতে সংস্থাটির ভূমিকা বিভিন্ন পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরেন। আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপনের মাধ্যমে ভোজ্যতেলে ভিটামিন-এসহ অন্যান্য জরুরি পণ্যের মান পরীক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি জানান।
তিনি বলেন, ভোক্তাদের সুবিধা ও সেবা গ্রহণ সহজ করতে ডিজিটাল সেবা, কিউআর কোড এবং ১৬১১৯ হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। বাজারে পণ্যের গুণগতমান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হবে।
প্রধান অতিথি চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) ও পরিচালক (স্থানীয় সরকার) মনোয়ারা বেগম বলেন, পণ্যের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিএসটিআই কোনো ধরনের ছাড় বা আপস করতে পারে না। শতভাগ গুণগতমান নিশ্চিত করেই লাইসেন্স দিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামে আধুনিক পরীক্ষাগারসহ নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে সেবাগ্রহীতারা হয়রানি ছাড়াই দ্রুত সেবা পান। পণ্যের মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনকল্যাণ ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ না করলে পণ্যের মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বিএসটিআইয়ের সেবা ও কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত ও সচেতন করতে বড় বড় বিপণিবিতানে প্রচারণামূলক ব্যানার টাঙানোরও পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষ অতিথি পাঠান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি) মো. সাইদুজ্জামান বলেন, বিএসটিআইয়ের লোগো মানুষের আস্থার প্রতীক। তাই দেশীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও মান নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। অপচয় রোধে জ্বালানি নিরীক্ষা চালু, কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবার তথ্য সহজলভ্য করা এবং পরীক্ষাগারের নমুনার পাশাপাশি বাজারে বিক্রি হওয়া পণ্যের মান নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশেষ অতিথি কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবায় ভেজাল রোধ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর বাজার তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
ভোক্তাদের সঠিক ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত করতে বিএসটিআইয়ের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ও সচেতন মহলের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক (সিএম) শিমু বিশ্বাস ও ফারহানা জাহান পারুল। সভায় বক্তব্য দেন সংস্থাটির উপপরিচালক (রসায়ন) ইব্রাহীম খলিল।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৪/১০/২০২৬