শারদীয় দুর্গাপূজায় মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর সম্প্রীতির আবহ। তবে জয়পুরহাট শহরের মাদারগঞ্জ দুর্গামন্দিরে এবার ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে শান্তি, মানবিকতা, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও নৈতিকতার শিক্ষা। মন্দিরের বিভিন্ন কক্ষে সাজানো মাটির প্রতিমায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনির নানা অধ্যায়। আর দেওয়ালে লেখা বাণীগুলো দর্শনার্থীদের দিচ্ছে মানবকল্যাণ ও আত্মশুদ্ধির বার্তা।
মন্দিরের মূল চত্বর পেরিয়ে সুসজ্জিত কক্ষগুলোতে দেখা যায় রঙিন পোশাক, মুকুট ও অলংকারে সাজানো দেব-দেবী এবং বীর যোদ্ধাদের মাটির প্রতিমা। এসব প্রতিমায় তুলে ধরা হয়েছে পৌরাণিক ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
কোথাও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে মহাবীর বার্বরীকের পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীকৃষ্ণ। দৃশ্যটি আত্মত্যাগ ও অহংকারমুক্তির শিক্ষা দেয়। অন্য কক্ষে রয়েছে মা যশোদা ও শিশু কৃষ্ণের বাৎসল্য লীলা, সূর্যের বরে কুন্তীর বরপ্রাপ্তি ও ত্যাগ, প্রজাপতি ব্রহ্মার অহংকার চূর্ণের ঘটনা, মনসার নয়নে চণ্ডীর আঘাত এবং শনিদেবের প্রতি পার্বতীর বর প্রদানের কাহিনি। পাতালে প্রবেশ করে কন্যা দুবদুবির কাছে বীর হনুমানের বিনম্রভাবে সাহায্য চাওয়ার দৃশ্যও স্থান পেয়েছে এ আয়োজনে।
দেওয়ালে শান্তি ও মানবিকতার আহ্বান
মাদারগঞ্জ দুর্গামন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ এর দেওয়ালে লেখা বিভিন্ন বাণী। কোথাও লেখা, ‘যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই’। সংক্ষিপ্ত এই বার্তায় ফুটে উঠেছে সংঘাতমুক্ত পৃথিবীর প্রত্যাশা।
প্রকৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝাতে একটি ফলকে লেখা হয়েছে, ‘গাছ কাটা অভিশাপ, গাছ বাঁচানো পুণ্য’। আত্মোপলব্ধি ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে রয়েছে ‘আত্মাকে জানলে, ঈশ্বরকে জানবে’ এবং ‘আমি ভালো হতে চাই’—এমন বাণী। অন্য একটি দেওয়ালে লেখা, ‘আমি যেন শিক্ষিত হতে চাই, পাশাপাশি ভালো মানুষও হতে চাই’।
এ ছাড়া ‘নদী যেমন সাগরে বিলীন হয়, ভক্তিতে ভক্ত ভগবানে মিশে যায়’—এমন কথায় তুলে ধরা হয়েছে ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার বিষয়টি। ‘সনাতন ধর্মের প্রতীক-মৃৎপ্রতিমা’ লেখাটিতে প্রকাশ পেয়েছে প্রতিমার ধর্মীয় তাৎপর্য।
পৌরাণিক কাহিনি ও এসব বাণীর সমন্বয়ে মন্দিরের আয়োজন পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। প্রতিমা দেখে শিশু-কিশোরেরা যেমন ধর্মীয় আখ্যান সম্পর্কে জানতে পারছে, তেমনি দেওয়ালে লেখা বার্তাগুলো তাদের শান্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষা ও মানবিকতা নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
বিবর্তনবাদ ও প্রকৃতির পরিবর্তনও উঠে এসেছে
মাদারগঞ্জ দুর্গামন্দির কমিটির সদস্য জগন্নাথ চন্দ্র বলেন, এবার তাঁরা মূলত শনিদেবকে কেন্দ্র করে আয়োজন করেছেন। শনিদেবের বিবাহের আসরসহ তাঁর বিভিন্ন ছবি স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনিও তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবর্তনবাদ তুলে ধরা হয়েছে, যা প্রাণীবিদ্যার একটি অংশ। প্রকৃতিকে স্বাভাবিকভাবে চলতে না দিলে সবকিছু পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এ বিষয়টি বোঝাতে তাঁরা একটি নদী তৈরি করেছেন, যেখানে কুমির, কচ্ছপ ও ব্যাঙ রাখা হয়েছে।
জগন্নাথ চন্দ্র আ বলেন, কিছুদিন আগে নেপালে হিমবাহের দৃশ্য দেখা গেছে। এটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলেও এর পেছনে মানবসৃষ্ট কারণও রয়েছে। এমন কিছু ধারণা তাঁরা মন্দিরের আয়োজনে ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
মাদারগঞ্জ দুর্গামন্দির কমিটির সভাপতি অমিত কুমার চৌধুরী বলেন, এবার দুর্গাপূজার সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পৌরাণিক কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এসব কাহিনির পরিচয় করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মন্দিরের দেওয়ালে শান্তি, মানবিকতা, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও নৈতিকতার বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, তাঁরা চান, মানুষ ধর্মীয় শিক্ষা ও বিশ্বাসের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও গ্রহণ করুক। সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আরও সুদৃঢ় হোক।
দেবী দুর্গার আরাধনায় অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জাগরণের প্রত্যাশা করা হয়। মাদারগঞ্জ দুর্গামন্দিরের প্রতিমায় পৌরাণিক ঐতিহ্যের প্রকাশ আর দেওয়ালের বাণীতে শান্তি, প্রকৃতি ও মানবিকতার আহ্বান—দুইয়ের সমন্বয়ে সেই শুভবোধই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
এসি/আপ্র/১৮/১০/২০২৬