একটি মুঠোফোনের জন্য তেরো বছরের শিশু অপ্রতিমকে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে হত্যা, আর ‘ভাত চুরি’ করার অপবাদে একুশ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র আজমুল হোসেনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা-একই সময়ে ঘটে যাওয়া এই দুটি ঘটনা কেবল দুটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এগুলো আমাদের সমাজের গভীরতর নৈতিক অবক্ষয়, অপরাধপ্রবণতা এবং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের নগ্ন প্রতিচ্ছবি। একটি শিশুর জীবনের মূল্য যদি একটি মুঠোফোনের চেয়ে কম হয়ে যায়, আর একজন তরুণের প্রাণ যদি এক প্লেট ভাতের অভিযোগে নিভে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে-আমরা কোন সমাজ নির্মাণ করছি?
কুমিল্লায় অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের দ্রুত তৎপরতা, সিসিটিভি বিশ্লেষণ এবং চারজনকে গ্রেফতারের ঘটনা তদন্তের সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের মুঠোফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গ্রেফতার চারজনের মধ্যে তিনজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে। তবে গ্রেফতারই শেষ কথা নয়। তদন্তে প্রতিটি তথ্য, আলামত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আদালতে গ্রহণযোগ্য অভিযোগপত্র দাখিল এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
খুলনার ঘটনাটি আরো ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতা সামনে এনেছে। ‘ভাত চুরি’ বা কোনো জিনিস চুরির অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে আটকে রেখে মারধর, অপমান কিংবা শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। অভিযোগের বিচার করার একমাত্র বৈধ পথ আইন। আজমুলকে মারধর করে ছাদে নেওয়া এবং সেখান থেকে পড়ে যাওয়া, পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া এবং তার মৃত্যুর ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরো ২০ থেকে ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভিযোগের প্রকৃত সত্য, মৃত্যুর কারণ এবং প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে।
দুটি ঘটনাতেই আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক-অপরাধের সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ততা। কুমিল্লার ঘটনায় পুলিশ কয়েকজন কিশোর ও তরুণের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে। খুলনার ঘটনাতেও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদান করবে, আর শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের দায়িত্ব পরিবার বা সমাজের ওপর ছেড়ে দেবে-এই ধারণা আর যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহমর্মিতা, মানবিক বোধ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, বিরোধ মীমাংসার সংস্কৃতি এবং অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে বাস্তব শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে আবাসিক মেস, ছাত্রাবাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। ভাড়াটিয়া ও মেস ব্যবস্থাপনা, বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ, নজরদারি, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের হস্তক্ষেপ-এসব বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী নিখোঁজ হলে দ্রুত অনুসন্ধান, আর কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে গণপিটুনি নয়-আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়ার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
অপ্রতিম ও আজমুল আর ফিরবে না। তাদের মা-বাবা ও স্বজনদের কোনো রাজ্য দান করলেও সন্তান হারানোর বেদনা রয়েই যাবে। কিন্তু এসব মৃত্যু যদি রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজকে আরো একটি হত্যাকাণ্ড ঠেকানোর শিক্ষা না দেয়, তবে এই শোকও অর্থহীন হয়ে যাবে। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হবে বিচারের ভিত্তি; আর বিচার হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক। আমাদের এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব-এমন বাংলাদেশ নিশ্চিত করা, যেখানে একটি মুঠোফোন কিংবা এক প্লেট ভাতের চেয়েও মানুষের জীবনের মূল্য অসীম।
সানা/আপ্র/২১/৯/২০২৬