একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিবারের পৃথিবী থমকে যায়। সন্তানের ফেরার আশায় উৎকণ্ঠিত বাবা-মায়ের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে অনিশ্চয়তায়। সেই শিশু যখন জীবিত নয়, নিথর দেহ হয়ে ফিরে আসে, তখন শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধও প্রশ্নের মুখে পড়ে। কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড তাই নিছক একটি অপরাধের ঘটনা নয়; এটি আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলে দিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন সহিংসতা ও অপরাধে ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও জানিয়েছে সংস্থাটি। আর পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন; এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ শিশুর। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়।
প্রতিটি সংখ্যা একটি মুখ, একটি নাম, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত শৈশব। আরো ভয়াবহ হলো, নিখোঁজের পর শিশুদের কারো লাশ মিলছে মাটিচাপা অবস্থায়, কারো নদী বা জলাশয়ে। অর্থাৎ শিশুর নিখোঁজ হওয়াকে দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করার মতো কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। অপ্রতিমের ঘটনা সেই ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। পুলিশ জানিয়েছে, মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজন তরুণসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং দুই কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান। তদন্ত ও বিচার অবশ্যই আইনের নিজস্ব গতিতে এগোবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে জীবিত উদ্ধারে রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধানব্যবস্থা কতটা দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকরভাবে কাজ করছে?
নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টাই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তথ্যের বিচ্ছিন্নতা, থানাভিত্তিক সীমাবদ্ধতা, উদ্ধার হওয়ার পর তথ্য হালনাগাদ না করা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি অনুসন্ধানকে দুর্বল করে। পুলিশ নিজেও স্বীকার করেছে, ফিরে আসা বা উদ্ধার হওয়া শিশুর তথ্য সব সময় থানায় হালনাগাদ না হওয়ায় প্রকৃত চিত্রে অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে। এখন আর বিচ্ছিন্ন তদন্ত, কয়েকজন আসামি গ্রেফতার এবং সংবাদ সম্মেলনের মধ্যে দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। নিখোঁজ শিশুর জন্য জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত অনুসন্ধানব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রতিটি থানায় তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রবাহ, কেন্দ্রীয়ভাবে হালনাগাদযোগ্য তথ্যভান্ডার, সীমান্ত ও পরিবহনপথে সতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও এলাকার নজরদারি এবং পরিবারকে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা কেন ঘটল এবং উদ্ধারে কোথায় ঘাটতি ছিল, তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের নিরাপত্তা কোনো প্রশাসনিক অনুগ্রহ নয়; রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ। যে রাষ্ট্র একটি শিশুকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে দিতে পারে না, তার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার সব অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আমরা আর এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে সন্ধ্যায় নিখোঁজ হওয়া শিশুর জন্য রাতভর পরিবার অপেক্ষা করবে, আর ভোরে কোনো অচেনা স্থান থেকে উদ্ধার হবে তার নিথর দেহ। প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য। তাই একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র জেগে ওঠে- এখন সময় সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার। আর কোনো অপ্রতিম যেন রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মূল্য দিয়ে আমাদের বিবেককে নাড়া দিতে না আসে।
সানা/আপ্র/২২/৯/২০২৬