তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের বাজারে যে চিত্র এখন দৃশ্যমান, তা নিছক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা নয়; এটি বাজার ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও ভোক্তা সুরক্ষার গভীর দুর্বলতারও প্রকাশ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। অথচ নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে কোথাও ২ হাজার, কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এমনকি সংকটের কথা বলে বেশি দাম দিতে রাজি হলে সিলিন্ডার ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো স্বাভাবিক বাজারচিত্র হতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দেশে এলপিজির আমদানিতে ঘাটতি নেই। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার এবং আগস্টে ১ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় আমদানি পর্যাপ্ত হলে বাজারে সংকট থাকার কথা নয়। তাহলে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে ভোক্তাকে কেন সিলিন্ডার কিনতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। কারণ কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি, সরবরাহে কারসাজি কিংবা সরবরাহব্যবস্থার কোনো স্তরে অনিয়ম থাকলে শুধু নতুন দাম ঘোষণা করে সমস্যার সমাধান হবে না।
গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিলে ১২ কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ৯৭৫ টাকা। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৯৯ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিলেই দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। পরে কয়েক দফা কমে সেপ্টেম্বরে দাম নেমেছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকায়। এর পর অক্টোবরের শুরুতেই আবার ২৫২ টাকা বৃদ্ধি। এমন ঘন ঘন ও বড় মাত্রার ওঠানামা সাধারণ ভোক্তার জন্য শুধু অনিশ্চয়তাই বাড়ায় না, ব্যবসায়ীদের একটি অংশকে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগও করে দেয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ২৩টি দল ঢাকাসহ ১৬ জেলায় অভিযান চালিয়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে। এটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হলেও প্রশ্ন হলো, জরিমানার পরও যদি একই অনিয়ম চলতে থাকে, তবে সেই অভিযান কতটা কার্যকর? বাজার নিয়ন্ত্রণে চাই ধারাবাহিক নজরদারি, সরবরাহশৃঙ্খলার প্রতিটি ধাপে হিসাব যাচাই এবং অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কঠোর ব্যবস্থা।
বিইআরসি ১২টি আমদানিকারকের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়েছে। এ উদ্যোগ দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তে রূপ নিতে হবে। কোথায় কত এলপিজি এসেছে, কার কাছে গেছে, কী দামে বিক্রি হয়েছে এবং খুচরা পর্যায়ে কীভাবে মূল্য নির্ধারিত হয়েছে-তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ে তদারকি আরো জোরদার করতে হবে।
এলপিজি এখন দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি। তাই এ বাজারকে ব্যবসায়িক স্বেচ্ছাচারিতার ওপর ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারকে আমদানি পর্যায় থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত অর্থ আদায়, কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ভোক্তাকে শুধু অভিযোগ করার পরামর্শ নয়, ন্যায্য দামে পণ্য পাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এলপিজির বাজারে অরাজকতা চলতে থাকলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করবে সাধারণ মানুষই।
সানা/আপ্র/৬/১০/২০২৬