গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি, অসহিষ্ণুতার অশনিসংকেত

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৫৬ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৪:০৮ এএম ২০২৬
রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি, অসহিষ্ণুতার অশনিসংকেত
ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় সম্প্রীতিতে আঘাতের চেষ্টা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ঘটনাটি যে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একটি শিল্পকর্মে কালি দেওয়ার মধ্য দিয়ে কি ভিন্নমত প্রকাশিত হয়েছে, নাকি মতাদর্শিক বিরোধকে সাংস্কৃতিক বিদ্বেষে রূপ দেওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে?

রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন কবি নন; বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও চিন্তার জগতে তাঁর অবদান বিশ্বস্বীকৃত। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’র রচয়িতাও তিনি। তাঁর কোনো সাহিত্যকর্ম, দর্শন কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্ন তোলা, বিতর্ক করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীক নিয়েও যুক্তিনির্ভর আলোচনা করার অধিকার নাগরিকের রয়েছে। কিন্তু সমালোচনা ও অবমাননা এক বিষয় নয়। যুক্তির পরিবর্তে প্রতিকৃতি বিকৃত করা কোনো মতাদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে না; বরং ভিন্নমতকে সহ্য করার মানসিকতা কতটা সংকুচিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নই সামনে আনে।

ঘটনাটির সঙ্গে ভারতবিরোধী মনোভাবের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা উঠেছে। ভারতের রাজনৈতিক নীতি, সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্যিক বৈষম্য কিংবা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের সমালোচনা করা বৈধ। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতাকে সেই ভূখণ্ডের কোনো সাহিত্যিকের সৃষ্টির বিরুদ্ধে বিদ্বেষে পরিণত করা যুক্তিসংগত নয়। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক পরিচয়কে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করাও তাঁর অবদানকে খণ্ডিত করে। জাতীয় পরিচয় কোনো একক ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়; এর শক্তি বহুত্ব, সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষার অধিকার এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এ নিয়ে কোনো পরিবর্তনের দাবি উঠলে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত সংবিধান, ইতিহাস, জনমত ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আলোকে। দেয়ালচিত্র মুছে দেওয়া কিংবা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা সেই বিতর্কের গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে না। একই সঙ্গে কোনো বিশেষ মতাদর্শের বিরোধিতা করতে গিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে অবজ্ঞা করা কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের দেশবিরোধী আখ্যা দেওয়াও সমানভাবে পরিহার করতে হবে।

ঘটনার প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক কর্মীদের সমবেত রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’সহ বিভিন্ন গান পরিবেশনের পর জাতীয় সংগীত গেয়ে তাঁরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে প্রতিবাদের ভাষা যেন যুক্তি, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সীমা অতিক্রম না করে। সাংস্কৃতিক পরিসরকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মঞ্চে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।

এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বহুমাত্রিক। প্রথমত, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বিবেচিত হওয়ার নীতি অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্পকলা একাডেমি ও স্থানীয় প্রশাসনকে জনপরিসরের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত দেয়ালচিত্র পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিদ্বেষ কিংবা সহিংসতায় উসকানির অভিযোগও যাচাইযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

একটি দেয়ালচিত্রে কালি দেওয়া যায়, কিন্তু যুক্তি ও সৃজনশীলতার শক্তিকে এভাবে মুছে ফেলা যায় না। বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে মতাদর্শিক বিরোধের চেয়ে নাগরিকের অধিকার, ইতিহাসের সত্য এবং সাংস্কৃতিক বহুত্বকে বড় করে দেখতে হবে। রাষ্ট্রের শক্তি ভিন্নমত দমন করার সামর্থ্যে নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে ভিন্নমতকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিসর দেওয়ার সক্ষমতায়। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এই ঘটনা তাই কেবল একটি দেয়ালচিত্রের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতারও পরীক্ষা।
সানা/আপ্র/১২/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বন্দরের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় স্বার্থ, চুক্তিতে চাই পূর্ণ স্বচ্ছতা
১০ অক্টোবর ২০২৬

বন্দরের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় স্বার্থ, চুক্তিতে চাই পূর্ণ স্বচ্ছতা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়...

মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতির প্রতি অবমাননাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করুন
০৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতির প্রতি অবমাননাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করুন

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর ঘটনা শুধু একটি ভাস্কর্য অবমাননার ঘটনা নয়; বাং...

অনুতাপের শর্তে পুনর্মিলন, সহাবস্থানে ফিরুক রাজনীতি
০৮ অক্টোবর ২০২৬

অনুতাপের শর্তে পুনর্মিলন, সহাবস্থানে ফিরুক রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা ‘পুনর্মিলন’ শব্দটি এখন নিছক রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন নয়; এটি র...

বোমা হামলার হুমকি: নিরাপত্তায় আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই
০৭ অক্টোবর ২০২৬

বোমা হামলার হুমকি: নিরাপত্তায় আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক বোমা হামলার হুমকি দিয়ে ই-মেইল পাঠানোর ঘটনা নিছক আতঙ্ক সৃষ্টির একটি বিচ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

অটোরিকশার দাবির পক্ষে বলা নেতার আছে ৭০০ বাহন

অটোরিকশা চালকদের দাবি মেনে নেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ৭০০টি অটোরিকশা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেছেন, জনগণের কাছে বারবার খোলস বদলে পার পাওয়া যাবে না। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর মিরপুর-১২ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের পিলারে জুলাইয়ের চিত্রাঙ্কন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি করেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সাত শ অটোরিকশা থাকার অভিযোগকে কাল্পনিক, অসত্য ও ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চেয়েছে দলটি| প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন প্রশাসক সত্য বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে