মুম্বাইয়ের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে মাধ দ্বীপে প্রায় দেড় একর জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর বহু বছরের আপন ঠিকানা। বাইরে থেকে দেখলে এটি তারকার বিলাসবহুল বাংলো; কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়, বাড়িটি শুধু বসবাসের জায়গা নয়। এখানে পাশাপাশি বসবাস করছে মিঠুনের সংগ্রামের ইতিহাস, অভিনয়জীবনের সাফল্য, পারিবারিক স্মৃতি, পোষ্যপ্রেম এবং কয়েক দশকের নানা অর্জনের গল্প।
সম্প্রতি মিঠুনের ছেলে নমাশি চক্রবর্তী ও মহাক্ষয় চক্রবর্তী বাড়িটির ভেতরের নানা অংশ ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। সেই সুবাদে বহু বছর ব্যক্তিগত পরিসরে থাকা এই বাংলোর বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে নতুন করে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যদের জন্য আলাদা কুটির, সবুজ বাগান, পোষ্যদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা, শরীরচর্চার ব্যবস্থা, দাফতরিক কাজের জায়গা, অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা এবং চিত্রগ্রহণের জন্য নিজস্ব পরিসর-সব মিলিয়ে বাংলোটি যেন একটি ছোট্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ জগৎ।
ছেলের নামে ‘মিমোহ কটেজ’
১৯৮৫ সালে এই সম্পত্তি কিনেছিলেন মিঠুন। তাঁর বড় ছেলে মহাক্ষয় চক্রবর্তীর ডাকনাম মিমোহ। সেই নামেই বাড়িটির একটি অংশের নাম রাখা হয়েছে ‘মিমোহ কটেজ’। শুরুতে জায়গাটি ছিল মূলত অবকাশযাপনের বাড়ি। পরে সময়ের সঙ্গে পরিবারের স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়। বাড়িটি বড় হতে হতে একাধিক পৃথক কুটির, পারিবারিক উঠান ও নানা সুবিধাসমৃদ্ধ একটি বিস্তৃত আবাসিক পরিসরে রূপ নেয়।
কুটিরগুলোর বিন্যাসও বেশ আলাদা। পরিবারের সদস্যদের জন্য রয়েছে পৃথক থাকার ব্যবস্থা। অতিথিদের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। একটি কাঠের কুটিরের আদলে তৈরি অংশ একসময় শোবার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরে সেটিকে আধুনিক শরীরচর্চাকেন্দ্রে রূপ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাড়ির ঐতিহ্যবাহী আবহের সঙ্গে আধুনিক জীবনযাপনের প্রয়োজনও মিলেছে।
সবুজের মধ্যে গড়ে উঠেছে শান্তির জগৎ
মাধ দ্বীপের এই বাড়িটির অন্যতম আকর্ষণ এর বিস্তীর্ণ সবুজ প্রাঙ্গণ। বড় বড় গাছ, পরিচর্যা করা বাগান, হাঁটার জায়গা এবং নানা ধরনের গাছপালায় ঘেরা পুরো বাড়িটি মুম্বাইয়ের ব্যস্ত নগরজীবনের বিপরীত এক শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে। বাগানের একাংশে রয়েছে গাছের ওপর তৈরি ছোট্ট ঘরও।
বাড়ির এই সবুজ পরিবেশের সঙ্গে মিঠুনের পোষ্যপ্রেমও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রতিবেদনে জানা গেছে, পরিবারটির প্রায় ২২টি পোষ্যের জন্য আলাদা জায়গা ও চলাফেরার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বাংলোর একটি বড় অংশ কার্যত পোষ্যদের জন্যও নিবেদিত।
এক বাড়িতে পরিবার, কাজ ও সৃজন
মিঠুনের বাংলোটি কেবল পারিবারিক আবাস নয়। বাড়ির ভেতরেই রয়েছে দাফতরিক কাজের জায়গা এবং চিত্রগ্রহণের জন্য নিজস্ব স্টুডিও। পরিবারের কাজ ও পেশাগত প্রয়োজন - দুই দিকই বিবেচনায় রেখে বাড়িটির বিভিন্ন অংশ সাজানো হয়েছে।
এ ছাড়া বাড়িটির একটি অংশ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বিয়ের আয়োজনের জন্যও ব্যবহার করা হয়। ফলে ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে পেশাগত কর্মকাণ্ডেরও এক ধরনের মেলবন্ধন ঘটেছে এই বাংলোয়।
দেয়ালে দেয়ালে অভিনয়জীবনের গল্প
মিঠুনের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা স্মৃতিও বাড়িটির ভেতরে বিশেষভাবে সংরক্ষিত। বসার ঘরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে পুরস্কার, আলোকচিত্র, ভক্তদের আঁকা ছবি, বিভিন্ন স্মারক ও তাঁর অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের নানা নিদর্শন। এক অর্থে এই অংশটি মিঠুনের ব্যক্তিগত স্মৃতিসংগ্রহশালার মতো।
তাঁর অভিনয়জীবনের সাফল্যের পাশাপাশি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের স্মৃতিও সেখানে জায়গা পেয়েছে। ফলে বাড়ির ভেতর দিয়ে হাঁটলে যেন একজন অভিনেতার কয়েক দশকের পথচলার দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
যে হলুদ গাড়ি আজ সংগ্রামের স্মারক
এই বিশাল বাংলোর সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতিচিহ্ন সম্ভবত একটি পুরনো হলুদ রঙের গাড়ি। এটি মিঠুনের ভক্সওয়াগন বিটল। আজ গাড়িটি আর চলাচলের উপযোগী নয়। কিন্তু মিঠুনের পরিবারের কাছে এর মূল্য অন্য সবকিছুর চেয়ে আলাদা।
অভিনয়জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে মুম্বাইয়ে তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর একসময় তাঁর নিজের থাকার জায়গাও ছিল না। পরিবারের সদস্যদের বর্ণনা অনুযায়ী, জীবনের সেই কঠিন সময়ে তিনি প্রায় ১৫ দিন এই হলুদ গাড়ির ভেতর ঘুমিয়েছিলেন। এমনকি গোসলের জন্য একটি স্থানীয় শরীরচর্চাকেন্দ্রে যেতেন এবং সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে সহযোগিতা করতেন।
আজ সেই গাড়িটিই দাঁড়িয়ে আছে মিঠুনের বিশাল বাংলোর আঙিনায়। একদিকে কয়েক দশকের তারকাখ্যাতি, অন্যদিকে জীবনের শুরুর দিকের অনিশ্চয়তা - একই বাড়ির আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই বাস্তবতা মিঠুনের জীবনকাহিনিকে যেন আরো স্পষ্ট করে তোলে।
তারকাদের আনাগোনারও সাক্ষী
মিঠুনের এই বাংলোর সঙ্গে বলিউডের বহু পরিচিত মুখের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিগত আয়োজনে ধর্মেন্দ্র, জিতেন্দ্রসহ একাধিক তারকার উপস্থিতির স্মৃতি রয়েছে এই বাড়িকে ঘিরে। ফলে এটি শুধু মিঠুনের পারিবারিক আবাস নয়; তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের সামাজিক পরিসরেরও একটি স্মারক।
তবে বাড়িটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার আড়ম্বর নয়, বরং ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে তারকার বর্তমান জীবনের অদ্ভুত সহাবস্থান। এক পাশে পুরস্কার, ছবি ও সাফল্যের স্মারক; অন্য পাশে সেই পুরনো হলুদ গাড়ি, যা মনে করিয়ে দেয় মুম্বাইয়ে তাঁর শুরুর দিনগুলোর অনিশ্চয়তা।
বাংলো যেন মিঠুনের জীবনের আয়না
মাধ দ্বীপের এই বাংলো তাই শুধু একটি বিলাসবহুল বাড়ির গল্প নয়। প্রায় দেড় একরের এই বিস্তীর্ণ পরিসরে মিঠুন যেন নিজের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়কে পাশাপাশি রেখে দিয়েছেন। পরিবারকে ঘিরে আলাদা কুটির, সবুজ বাগান, পোষ্যদের জন্য জায়গা, শরীরচর্চাকেন্দ্র, দাফতরিক পরিসর, চিত্রগ্রহণের ব্যবস্থা এবং অভিনয়জীবনের স্মৃতিতে সাজানো বসার ঘর - সবকিছু মিলিয়ে এটি তাঁর বর্তমান জীবনের প্রতিচ্ছবি।
আর উঠানে রাখা পুরনো হলুদ গাড়িটি মনে করিয়ে দেয়, রাজকীয় এই জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। একসময় থাকার জায়গা না পাওয়া সেই তরুণই পরে বলিউডের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা হয়ে নিজের জন্য গড়ে তুলেছেন এমন এক ঠিকানা, যেখানে সাফল্যের জৌলুসের পাশাপাশি যত্ন করে বেঁচে আছে সংগ্রামের স্মৃতিও।
মিঠুনের মুম্বাইয়ের এই বাংলো তাই শুধু বাড়ি নয় - এটি এক অভিনেতার স্বপ্ন, লড়াই, সাফল্য, পরিবার ও স্মৃতিকে একই ছাদের নিচে ধরে রাখা জীবন্ত এক গল্প।
সানা/আপ্র/৪/১০/২০২৬