সাজ্জাদ সাব্বির
পুলিশ সদস্যদের হাতে রাষ্ট্র দায়িত্ব, ক্ষমতা এবং জননিরাপত্তার ভার তুলে দেয়। প্রতিদিনের কর্মজীবনে তাদের এমন সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়- যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ নয়। অপরাধ, সহিংসতা, দুর্ঘটনা, মৃতদেহ, যৌন সহিংসতার ঘটনা, পারিবারিক বিরোধ, জনতার উত্তেজনা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টা তাদের পেশাগত জীবনের বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিজের পরিবার, অর্থনৈতিক চাপ, সন্তানদের দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন। এই পেশার মানসিক মূল্য নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা খুব কম। অথচ সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, বিষয়টি অবহেলা করার মতো অবস্থায় নেই।
২০২৬ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত বাংলাদেশের আট বিভাগের ২৭ জেলার ৪১৩ জন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডিএএসএস-২১ মানদণ্ডে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পুলিশ সদস্য বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের উপসর্গ বহন করছেন। গবেষণায় প্রায় ৩০ শতাংশের মধ্যে গুরুতর থেকে অত্যন্ত গুরুতর মাত্রার বিষণ্নতার উপসর্গ পাওয়া গেছে। উদ্বেগের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং মানসিক চাপের ক্ষেত্রে প্রায় ১৮ শতাংশ।
গবেষণাটিতে সাংগঠনিক চাপ, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ এবং পর্যাপ্ত কল্যাণমূলক সহায়তার ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান পুরো বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্যের মানসিক অবস্থার চূড়ান্ত চিত্র নয়। গবেষণাটির নমুনা ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবু দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত তথ্য পুলিশের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়।
একটি প্রতিবেদনে পুলিশের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলার বিষয়টি তুলে ধরেছিল। প্রতিবেদনে কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক সংকট, বিবাহবিচ্ছেদ এবং আত্মহানির ঘটনাকে পুলিশের কল্যাণব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যাটি পুরোনো হলেও এ নিয়ে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা পিছিয়ে আছে। আরেকটি গবেষণা-পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত ব্যাধি (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) এবং বিষণ্নতার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পুলিশি পেশায় নিয়মিত সহিংসতা ও মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতার সংস্পর্শ এর একটি বড় কারণ।
পুলিশকে আমরা সাধারণত একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখি। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যরাও মানুষ। প্রতিদিন অন্য মানুষের সংকট সামলাতে সামলাতে তাদের নিজস্ব মানসিক সক্ষমতার ওপর যে চাপ তৈরি হয়, সেটিকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, বারবার মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতার সংস্পর্শ, দীর্ঘস্থায়ী কর্মচাপ, ঘুমের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে পারিবারিক চাপ যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রে বিষয়টির একটি অতিরিক্ত মাত্রা রয়েছে। তারা এমন একটি পেশায় নিয়োজিত, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাই পুলিশের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটিকে পেশাগত নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
কোনো পুলিশ সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নির্দিষ্ট সময় পরপর মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শসেবা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার কাঠামো থাকা জরুরি; বিশেষ করে যেসব সদস্য নিয়মিত অস্ত্র বহন করেন, তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নকে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের আওতায় আনা যেতে পারে। তবে এই মূল্যায়ন যেন শাস্তির হাতিয়ার না হয়। চাকরি, পদোন্নতি বা বদলির ভয় থাকলে কোনো সদস্য নিজের মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করতে চাইবেন না। এক্ষেত্রে গোপনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জাস্টিসের একটি জাতীয় জরিপেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং সহায়তা চাওয়ার সংকোচকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের জন্য পরিচালিত মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলো কার্যকর করতে আস্থার পরিবেশ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পুলিশেও একটি স্বাধীন পুলিশ মানসিক সুস্থতা ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই ব্যবস্থা পরিচালিত হতে পারে। একজন সদস্য নিজের ইচ্ছায় সেখানে সেবা নিতে পারবেন। এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পর পর সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে। উচ্চচাপের দায়িত্ব পালনের পর বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা থাকা দরকার। দীর্ঘ সময় ধরে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণ, বড় ধরনের সহিংসতা, ভয়াবহ দুর্ঘটনা, খুন, শিশু নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার তদন্তের মতো দায়িত্ব পালনের পর মানসিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
পরামর্শসেবাকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত করতে হবে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে ১০টি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় ৬৩৭ জন পুলিশ সদস্যের ওপর বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য হস্তক্ষেপের ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে মানসিক স্বাস্থ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপের ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া গেছে। পরিবারকেও এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। পুলিশ সদস্যের মানসিক চাপ অনেক সময় কর্মস্থল থেকে বাসায় পৌঁছে যায়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ছুটির অনিশ্চয়তা এবং দায়িত্বের চাপ পারিবারিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবার যদি মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকে, তাহলে সংকটের লক্ষণ আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এখানে রাষ্ট্রের বিনিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
একজন পুলিশ সদস্যকে নিয়োগের পর প্রশিক্ষণ দিতে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। তার দক্ষতা তৈরি করতে বছরের পর বছর লাগে। একজন প্রশিক্ষিত সদস্য মানসিক সংকটে পড়ে কর্মক্ষমতা হারালে ক্ষতিা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিষ্ঠান তার দক্ষ জনবল হারাবে, পরিবার তার প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে এবং রাষ্ট্রের বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পুলিশ সংস্কারের আলোচনায় আমরা সাধারণত কাঠামো, নিয়োগ, পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহি এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে কথা বলি। মানসিক স্বাস্থ্যকে সেই আলোচনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই। কারণ, যে মানুষটি প্রতিদিন অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তার নিজের মানসিক নিরাপত্তার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
পুলিশের হাতে দায়িত্ব থাকবে, ক্ষমতা থাকবে, মানুষের জীবন রক্ষার ভার থাকবে। সেই দায়িত্ব পালনকারী মানুষটির মানসিক সুস্থতা রক্ষার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। একজন পুলিশ সদস্যকে শক্ত থাকতে বলার চেয়ে তাকে শক্ত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
লেখক: রাজনৈতিক কর্মী ও বিশ্লেষক
কেএমএএ/আপ্র/১৮.১০.২০২৬