হাড় ও দাঁত মজবুত রাখা, পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ভিটামিন ডি। সূর্যের আলো ও বিভিন্ন খাবার থেকে এই ভিটামিন পাওয়া যায়। তবে এটি নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণার কারণে অনেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণে অবহেলা করেন। আবার কেউ কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ভিটামিন ডির সম্পূরক গ্রহণ করেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ভিটামিন ডি সম্পর্কে প্রচলিত ছয়টি ভুল ধারণা এবং সেগুলোর সঠিক তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
সূর্যের আলোই ভিটামিন ডির একমাত্র উৎস
এ ধারণা সঠিক নয়। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। তবে চর্বিযুক্ত মাছ, ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ কিছু খাবার থেকেও এই ভিটামিন পাওয়া যায়। ত্বকের রং, বয়স, ঋতু ও সূর্যালোকের তীব্রতার ওপর শরীরে ভিটামিন ডি তৈরির পরিমাণ নির্ভর করে। জানালার কাচ ভেদ করে আসা সূর্যের আলো ত্বকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরিতে কার্যকর নয়।
প্রতিদিন রোদে থাকলেই ভিটামিন ডির ঘাটতি হবে না
নিয়মিত সূর্যের আলো পেলেও সবার শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হয় না। বয়স বৃদ্ধি, ত্বকের গাঢ় রং, ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটানো এবং চর্বি শোষণে সমস্যা থাকলে এই ভিটামিনের ঘাটতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শুধু সূর্যের আলোর ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
দুধ খেলেই ভিটামিন ডির চাহিদা পূরণ হয়
দুধ ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে সব দুধে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকে না। কিছু দেশে দুধে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি যোগ করা হয়। তাই প্যাকেটজাত দুধ কেনার সময় পুষ্টি-তথ্যের লেবেল দেখে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি চর্বিযুক্ত মাছ, ডিম এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
ভিটামিন ডি শোষণের জন্য বেশি চর্বি খেতে হয়
ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবণীয়। খাবারের সঙ্গে পরিমিত চর্বি থাকলে শরীরে এই ভিটামিনের শোষণ বাড়তে পারে। তবে এ কারণে অতিরিক্ত তেল, ঘি বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রয়োজন নেই। মাছ, বাদাম ও বীজের মতো পুষ্টিকর খাবার সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। ভিটামিন ডি শোষণের জন্য অতিরিক্ত চর্বি গ্রহণের বদলে সুষম খাবার খাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
বেশি ভিটামিন ডি গ্রহণ করলে বেশি উপকার পাওয়া যায়
এ ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন ডির সম্পূরক গ্রহণ করলে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে বমি বমি ভাব, দুর্বলতা, কিডনিতে পাথর এবং গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতি হতে পারে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তঃস্রাবী রোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সুস্থ ৭৫ বছরের কম বয়সী অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে দৈনিক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি ভিটামিন ডি নিয়মিত গ্রহণে বাড়তি উপকার পাওয়ার যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি গ্রহণ করা উচিত নয়।
সবার ভিটামিন ডি পরীক্ষা ও সম্পূরক গ্রহণ প্রয়োজন
এ ধারণাও সঠিক নয়। বয়স, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা ও ঘাটতির ঝুঁকি অনুযায়ী ভিটামিন ডির প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে রক্তে ২৫-হাইড্রক্সিভিটামিন ডির মাত্রা পরীক্ষা করতে পারেন। তবে উপসর্গহীন ও সুস্থ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের নিয়মিত এই পরীক্ষা করানো প্রয়োজন—এমন সুপারিশ নেই। ঘাটতির সন্দেহ থাকলে বা বিশেষ স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সুস্থ থাকতে যা মনে রাখবেন
ভিটামিন ডির ঘাটতি প্রতিরোধে সুষম খাদ্যাভ্যাস, উপযুক্ত সূর্যালোক এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূরক গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবার প্রয়োজন এক নয়। তাই কোনো একটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ।
ডিসি/আপ্র/২০/১০/২০২৬