জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রথম দিনে ৩৭ মিনিটের ভাষণ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে দেওয়া ভাষণে তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, গাজা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার, বিনিয়োগ এবং ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।
ভাষণে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তবে তাঁর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিকে তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে সেগুলোর কিছু অতিরঞ্জিত, কিছু বিভ্রান্তিকর এবং কিছু সরাসরি তথ্যের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে দেখা যায়। সিএনএনের তথ্য যাচাইয়ে এসব দাবির কয়েকটি খতিয়ে দেখা হয়েছে।
আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি: ট্রাম্প ভাষণে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আটটি যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছেন। তিনি এটিকে নিজের জন্য বড় সম্মানের বিষয় বলেও উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প যেসব সংঘাতের কথা বলেছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, কসোভো-সার্বিয়া, রুয়ান্ডা-গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান, গাজা, ইসরায়েল-ইরান এবং মিসর-ইথিওপিয়া।
তবে এসব ঘটনাকে আটটি যুদ্ধ হিসেবে গণনা করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্পের তালিকায় থাকা মিসর-ইথিওপিয়া বিরোধ মূলত ইথিওপিয়ার একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক বিরোধ; ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময় এটি কোনো যুদ্ধ ছিল না। একইভাবে কসোভো-সার্বিয়ার মধ্যকার পরিস্থিতিও সে সময়ে যুদ্ধ হিসেবে চলছিল না।
রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রেও সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় শান্তি চুক্তি হলেও সেখানে সহিংসতা ও সংঘাতের ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে। গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকার খবর রয়েছে।
এ ছাড়া ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী সংঘাত বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা থাকলেও পরে দুই দেশের মধ্যে আবারো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ফলে আটটি যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—ট্রাম্পের এই দাবি সরলভাবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন সতর্কতাকে বিদ্রূপ করতে গিয়ে ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, যাঁরা একসময় বলেছিলেন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে, তাঁরাই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে ধ্বংস করবে বলে সতর্ক করছেন।
ট্রাম্প আরো বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’ নামটি পরে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ করা হয়েছে, কারণ পৃথিবী উষ্ণ না হয়ে ঠান্ডা হচ্ছিল।
এই বক্তব্যের একাধিক অংশ তথ্যের সঙ্গে মেলে না। ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’ এবং ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ একই অর্থে ব্যবহৃত দুটি শব্দ নয়। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাকে বোঝাতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলা হয়; আর এর ফলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠ ও আবহাওয়ার বিভিন্ন ব্যবস্থায় যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, তা বোঝাতে জলবায়ু পরিবর্তন শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার বদলে ঠান্ডা হচ্ছে—এমন দাবিরও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রেকর্ড রাখার সময়ের মধ্যে সর্বশেষ ১১ বছরই ছিল সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল এর মধ্যে তিনটি উষ্ণতম বছর।
‘১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে’—জলবায়ুবিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার সুযোগ ধরে রাখতে হলে পরবর্তী প্রায় ১২ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। সেই সতর্কতাকে ‘১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে’ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের দাবি: ট্রাম্প ভাষণে বলেন, তাঁর প্রশাসন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছে।
তবে এ অঙ্কের পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি। ভাষণের সময় হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা ছিল প্রায় ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানির ঘোষণা এবং এমন কিছু প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
ফলে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে—ট্রাম্পের এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যাচ্ছে না এবং প্রকাশিত সরকারি হিসাবের সঙ্গেও তা মেলে না।
মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে ঘাটতি নেই—ট্রাম্পের দাবি: ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে—এমন দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এত বেশি অস্ত্র রয়েছে যে সেগুলো কখনো ব্যবহার করার কথাও ভাবা যায় না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নজিরবিহীন হারে অস্ত্র তৈরি করছে।
তবে এ বক্তব্যও পুরোপুরি তথ্যসমর্থিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের পরিদর্শক দপ্তর এবং কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপক ব্যবহৃত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় মজুত করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অস্ত্রভান্ডার পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমন দাবি যেমন সঠিক নয়, তেমনি কোনো ধরনের ঘাটতিই নেই—ট্রাম্পের এই দাবিও সাম্প্রতিক সরকারি ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ওয়াশিংটনে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমার দাবি: যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে অপরাধের হার ৮৭ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, গত বছরের ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার সময় ওয়াশিংটন অপরাধে জর্জরিত ছিল; এখন অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমে গেছে এবং তাঁরা তা শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
তবে সামগ্রিক অপরাধের হিসাব এ দাবিকে সমর্থন করে না। ওয়াশিংটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সোমবার পর্যন্ত রাজধানীতে ১৫ হাজারের বেশি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ের ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ২৩ শতাংশ কম।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনে অপরাধ কমেছে, কিন্তু সামগ্রিক অপরাধের ক্ষেত্রে ৮৭ শতাংশ কমার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউস অতীতে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ধরনে বড় ধরনের পতনের হিসাব তুলে ধরে ট্রাম্পের বৃহত্তর দাবিকে সমর্থন করার চেষ্টা করেছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের হার কমার তথ্যকে সামগ্রিক অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে বলে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প আরো দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে এবং ইরানসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। তবে এসব বক্তব্যের বেশ কিছু অংশ রাজনৈতিক অবস্থান বা মূল্যায়ন; সেগুলোকে সরাসরি তথ্যগত দাবি হিসেবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তাঁর বক্তব্যের ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি খাতের নেতাদের মধ্যে মানবজাতির জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, যা কোনো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘে ট্রাম্পের ভাষণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল, যেগুলোর সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের সরাসরি মিল নেই। কোথাও তিনি সংখ্যা বাড়িয়ে বলেছেন, কোথাও চলমান সংঘাতকে শেষ হয়ে যাওয়া যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, আবার কোথাও বৈজ্ঞানিক বা সরকারি তথ্যের চেয়ে অনেক বড় দাবি করেছেন। সূত্র: সিএনএন
সানা/আপ্র/২৪/৯/২০২৬