পরকীয়া বর্তমানে ক্রমবর্ধমান একটি সামাজিক ও নৈতিক সমস্যা। এক সময় যে বিষয়টি সমাজে অত্যন্ত গোপন ও নিন্দনীয় হিসেবে বিবেচিত হতো, সময়ের পরিবর্তনে তা যেন অনেকের কাছে ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়- সব মিলিয়ে পরকীয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। পরকীয়া কেবল একজন নারী বা পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের মানসিক বিকাশ ও সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা। পরকীয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘদিনের অশান্তি, পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, একাকিত্ব, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কিংবা নতুন সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণ ইত্যাদি। এ বিষয় নিয়েই এবারের লাইফস্টাইল পাতার প্রধান ফিচার
দাম্পত্য সম্পর্কে বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন ওই বিশ্বাস ভেঙে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সঙ্গে আবেগিক বা শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়; তখন তার অভিঘাত শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা পুরো পরিবারকে অস্থির করে তোলে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। মা-বাবার বিচ্ছেদ, পারিবারিক কলহ কিংবা একজন অভিভাবকের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া শিশুর মনে গভীর অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। ফলে তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ, পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ধারা ৪৯৭ অনুযায়ী, পরকীয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। আবার ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৯ অনুযায়ী ধারা ৪৯৭-এর অপরাধে আদালতের আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট অভিযোগকারীর বিধান আছে। ফলে বাংলাদেশে ‘পরকীয়ার কোনো শাস্তি নেই’—এমন ধারণা আইনগতভাবে সঠিক নয়; বরং বিদ্যমান আইনের পরিধি, প্রয়োগের শর্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।
ইন্দোনেশিয়ার নতুন দণ্ডবিধি ২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে; ধারা ৪১১ অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য ব্যক্তির সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জন্য সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা নির্দিষ্ট মাত্রার জরিমানার বিধান আছে এবং মামলা সংশ্লিষ্ট স্বামী, স্ত্রী, বাবা-মা বা সন্তানের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাস্তবতা দেখায়, পরকীয়া মোকাবিলায় আইন একমাত্র সমাধান নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পারিবারিক অধিকার, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক মর্যাদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রথমত, দাম্পত্য জীবনে আন্তরিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধের চর্চা জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, সম্পর্কের সংকট দেখা দিলে গোপন সম্পর্কের পরিবর্তে পারিবারিক পরামর্শ, বৈবাহিক কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তা গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ব্যক্তিগত সীমারেখা, গোপনীয়তা ও পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, সন্তানদের সামনে পারিবারিক বিরোধকে সংঘাতপূর্ণ রূপ না দিয়ে তাদের মানসিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ষষ্ঠত, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিশোধ, হয়রানি, অপমান বা সহিংসতার পরিবর্তে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
পরকীয়ার মতো সংবেদনশীল সামাজিক সংকট প্রতিরোধে আইন, পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মূলত পরকীয়ার দায় কোনো একটি লিঙ্গের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি একটি সম্পর্কগত ও সামাজিক সমস্যা। কাউকে হেয় করা, অপমান করা কিংবা সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া কখনোই সমাধান হতে পারে না। বরং সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে দায়িত্বশীল ও মানবিক উপায়ে তা মোকাবিলা করা জরুরি।
আইন দিয়ে সব সামাজিক সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। আইন প্রয়োজন অপরাধ ও অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য; কিন্তু একটি সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়োজন বিশ্বাস, সততা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান ও নৈতিক শিক্ষা। তাই পরিবার থেকেই সন্তানদের সম্পর্কের মূল্য, দায়িত্ববোধ এবং অন্যের প্রতি সম্মান শেখাতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সম্পর্ক তৈরি করা যেমন সহজ হয়েছে; তেমনই ভুল সম্পর্কের দিকে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি। পরকীয়া শুধু একটি সম্পর্কের ভাঙন নয়; এর প্রভাব একটি পরিবারের বহু মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। পরিবারের ভিত শক্ত হলে সমাজ শক্ত হয়। আর ওই ভিতের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো বিশ্বাস, সততা ও পারস্পরিক সম্মান।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬