বাংলাদেশের কারাগারে থাকা মোট বন্দীর ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ বিচারপূর্ব বন্দী। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বন্দীর এখনো সাজা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ধারণক্ষমতার তুলনায় বাংলাদেশের কারাগারেই সবচেয়ে বেশি বন্দী রয়েছেন। দেশের কারাগারগুলোর প্রতি ১০০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে বন্দী রয়েছেন ২২৬ জন। ফলে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দীর দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবার ওপরে। কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। তুলনামূলকভাবে ভারত ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি কিছুটা কম চাপপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যের বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর ক্রাইম অ্যান্ড জাস্টিস পলিসি রিসার্চ পরিচালিত ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কারাগারগুলোর সরকারি ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এসব কারাগারে বন্দী ছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার ২২৬ দশমিক ১ শতাংশ বন্দী সেখানে অবস্থান করছেন। প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে কারাবন্দীর সংখ্যা ৫৯ জন।
তবে বাংলাদেশের কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্দীর সংখ্যা আরো বেড়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর কারাগারগুলোতে বন্দীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজারে। অথচ ধারণক্ষমতা আগের মতোই ৪৫ হাজার ১৮৬ জন।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার কারাগারে ধারণক্ষমতার ২১৬ শতাংশ বন্দী রয়েছেন। পাকিস্তানে এই হার ১৬৩ শতাংশ, নেপালে ১৪৪ শতাংশ, ভারতে ১১৩ শতাংশ এবং মিয়ানমারে ১১২ শতাংশ।
বিশ্বের হিসাবে ধারণক্ষমতার তুলনায় সবচেয়ে বেশি বন্দী রয়েছে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে। দেশটির কারাগারে ধারণক্ষমতার ৬১৭ শতাংশ বন্দী রয়েছে। বিপরীতে নাউরুর কারাগারে ধারণক্ষমতার মাত্র ১৪ শতাংশ বন্দী রয়েছে।
পতনের পর আবার বেড়েছে বন্দী: বাংলাদেশে কারাবন্দীর সংখ্যা দীর্ঘ সময় ধরে ওঠানামা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা দ্রুত বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০০ সালে। ওই বছর বাংলাদেশে কারাবন্দীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৬৬৯। পরবর্তী এক দশকে সর্বোচ্চ বন্দী ছিল ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে - ৮৬ হাজার ৮৩৮ জন। ২০২০ সালে কারাগারে বন্দী ছিলেন ৮৮ হাজার ৮৪ জন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগের দিন দেশের কারাগারগুলোতে বন্দী ছিলেন প্রায় ৮৮ হাজার। এরপর ১২ আগস্ট সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪৯ হাজারে। পরে আবার ধারাবাহিকভাবে বন্দীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, সাধারণত দেশের কারাগারগুলোতে ৮০ থেকে ৮২ হাজার বন্দী থাকেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার বাড়ায় কারাগারে বন্দীর চাপও বেড়েছে। বিশেষ করে মাদক, সাইবার অপরাধ ও কিশোর অপরাধের মামলায় গ্রেফতার ব্যক্তিরা কারাগারে আসছেন বলে জানান তিনি।
দেশে বর্তমানে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় ও ৬০টি জেলা কারাগার।
দুই-তৃতীয়াংশই বিচারাধীন: কারাগারে বন্দীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বিচারাধীন বন্দীর সংখ্যাও বড় চাপ তৈরি করছে। ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কারাগারে থাকা মোট বন্দীর ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ বিচারপূর্ব বন্দী। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বন্দীর এখনো সাজা হয়নি।
দক্ষিণ এশিয়ায় বিচারাধীন বন্দীর হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে - ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতে ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নেপালে ৫৩ শতাংশ বন্দী বিচারাধীন। এ দিক থেকে বাংলাদেশ ওই দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে।
সারা বিশ্বে বিচারাধীন বন্দীর হার সবচেয়ে বেশি সান মারিনোয়; দেশটির কারাগারে থাকা সব বন্দীকেই বিচারাধীন হিসেবে উল্লেখ করেছে ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ।
বাংলাদেশের কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কারাগার ব্যবস্থার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৭৮৮ সালে ঢাকায় একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে কারাগার প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। পরে ১৮৩৬ সালে ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লায় কারাগার নির্মাণ করা হয়। ১৯২৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারকে কেন্দ্রীয় কারাগার ঘোষণা করা হয়।
বিশ্বে বন্দীর সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে: জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষে থাকা ভারত ও চীনের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দীর সংখ্যা বেশি। ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে সেখানে কারাবন্দীর সংখ্যা ৫৪২।
চীনে সর্বশেষ ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী বন্দীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৯০ হাজার। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে বন্দীর সংখ্যা ছিল ১১৯। ভারতের ২০২৪ সালের হিসাবে কারাগারে বন্দী ছিলেন ৫ লাখ ১১ হাজারের বেশি। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে দেশটিতে বন্দীর সংখ্যা ৩৬।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮ হাজার। ২০২০ সালে মিয়ানমারে বন্দী ছিলেন এক লাখের কিছু বেশি। চলতি মাস পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় বন্দী প্রায় ৩৭ হাজার ৮০০ এবং গত আগস্ট পর্যন্ত নেপালে বন্দী ছিলেন ২৭ হাজার ৮০০ জন। ২০১৪ সালের হিসাবে ভুটানের কারাগারে বন্দী ছিলেন ১ হাজার ১১৯ জন।
বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলে প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার, তুরস্কে ৪ লাখ ৩৪ হাজার, রাশিয়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার, ইরানে ১ লাখ ৯৯ হাজার, যুক্তরাজ্যে ৮৬ হাজার, সৌদি আরবে ৪৮ হাজার এবং জাপানে ৪১ হাজার বন্দী রয়েছেন। ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের হিসাব করা ২২৪ দেশের মধ্যে টুভালু ও লিশটেনস্টাইনে বন্দীর সংখ্যা সবচেয়ে কম - মাত্র ১১ জন করে।
অতিরিক্ত বন্দীতে মানবেতর পরিবেশ: ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দী থাকায় দেশের কারাগারগুলোর চিকিৎসাসেবা, খাবারের মান ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক বন্দী দীর্ঘ সময় কারাগারে অবস্থান করছেন।
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশের কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বন্দীতে ঠাসা। এতে অনেক বন্দীকে মানবেতর পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু নতুন কারাগার নির্মাণ নয়, বিদ্যমান কারাগারগুলোর সম্প্রসারণও জরুরি।
বিচারপূর্ব বন্দীর বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের অনেক আদালতে একজন বিচারকের ওপর কয়েক হাজার মামলা রয়েছে। ফলে বিচারকাজ দ্রুত শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপূর্ব বন্দীদের দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হচ্ছে, যা কারাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
তাঁর মতে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচারকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ই-জুডিশিয়ারি চালু করে বিচারিক কার্যক্রমে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেওয়ানি মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ফৌজদারি মামলায় অপরাধ স্বীকারের বিনিময়ে আইনি সমঝোতার মতো ব্যবস্থা চালু করা গেলে আদালতের মামলার চাপ কমানো সম্ভব।
দেশের কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাওয়ায় একদিকে অবকাঠামোগত সংকট বাড়ছে, অন্যদিকে বিচারাধীন বন্দীর দীর্ঘ অবস্থান পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। ফলে কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত বিচার, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সানা/আপ্র/৭/১০/২০২৬