গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

মৃত্যুদণ্ড শ্রমিকের, মুনাফা রাষ্ট্রের: অভিবাসী শ্রমিকের নেক্রোপলিটিক্স

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫০ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৪৬ এএম ২০২৬
মৃত্যুদণ্ড শ্রমিকের, মুনাফা রাষ্ট্রের: অভিবাসী শ্রমিকের নেক্রোপলিটিক্স
ছবি

ছবি সংগৃহীত

মারজিয়া প্রভা

রাষ্ট্র আসলে ঠিক করে দেয়, কে বাঁচবে আর কে মরবে! সব আইনি সুরক্ষা ও মর্যাদাকে ছিনিয়ে নিয়ে মানুষকে ‘লিভিং ডেড’ হিসেবে রেখে এই রাষ্ট্র প্রতিমুহূর্তেই ঠিক করে দেয়, কে আসলে মরার যোগ্য। তাই সৌদি আরবে বাংলাদেশের দুই অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যুতে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘একটি শিক্ষা’ হিসেবেন দেখতে চান। এখানে নজরুল কিংবা সিতি না হয়ে, এই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যদি কোনও মন্ত্রী হতেন, কোনও পুঁজিপতি শ্রেণীর কেউ হতেন? শামা ওবায়েদ কি এভাবেই প্রেসনোট দিতে পারতেন? কিংবা বাংলাদেশে থাকা সৌদির কনস্যুলেটর কি এরকম ‘নীরবে’ মৃত্যদণ্ডের খবর নিয়ে উদাসীন থাকতে পারতেন? উত্তর অবশ্যই না।

নেক্রোপলিটিক্স কিংবা মৃত্যুর রাজনীতি ঠিক করে দেয়, মৃত্যু প্রক্রিয়ার শ্রেণী আছে, বেঁচে থাকার ওজন আছে। সে ওজন সবার জন্য সমান না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের গবেষণা বলছে, সৌদিতে ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের জুন অব্দি সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ১,৮১৬টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর ৫৯৭টি (৩২.৮ শতাংশ) শুধু মাদক অপরাধে, এবং এই ৫৯৭ জনের প্রায় ৭৫ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক। যে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৪ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক, সেখানে মৃত্যদণ্ড দেওয়া হয়- একটা বড় সংখ্যার অভিবাসী শ্রমিককে। এই মৃত্যদণ্ডের ৪৭ শতাংশই এসেছে তাজির বা বিচারকের বিবেচনায়। যে ব্যবস্থার কোনও সলিড দণ্ডবিধি নেই।

যে ২৫টি মৃত্যদণ্ড নিয়ে এই গবেষণাটি হয়েছিল, সেখানে ২৫ জন অভিযুক্তের একজনও কার্যকর আইনি সহায়তা পাননি, আইনজীবী পাননি। এর মধ্যে প্রায় ১৪ জন ভাষা জানতেন না বলে মারধর খেয়ে অপরাধ স্বীকারের নথিতে সই করে দিয়েছিলেন। হিউম্যান রাইটসের চলতি বছরের ২১ এপ্রিলের  প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যাচ্ছে, তিনজন ইথিওপিয়ান নাগরিককে ২০২৩-২৪ সালে সৌদিতে মৃত্যদণ্ড দেওয়া হয়, যারা কিনা টিগ্রে-যুদ্ধের শরণার্থী হয়ে কাজের খোঁজে এসেছিলেন। তারা ‘খাত’ নামক একটি গাছ বহন করেছিল, যা তাদের নিজ দেশে বৈধ হলেও সৌদিতে অবৈধ। কেবলই মাত্র এই অজ্ঞতার কারণে তাদেরকে মাদক মামলায় দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অথচ তারা নিজেরাই জানতো না তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী! এই ঘটনাগুলো আসলে প্রমাণ করে, অভিবাসী শ্রমিককে মৃত্যদণ্ড দেওয়া সৌদি রাষ্ট্রে শ্রেণিবিরোধী নেক্রোপলিটিক্সের অংশ। কারণ একইভাবে নিজেদের দেশে রাজবংশীয়কে তারা মারে না।

১৯৯১ সালে তৎকালীন সৌদি রাজা ফাহাদের ভাই প্রিন্স সাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণকালে দুই এশীয় নারী গৃহকর্মী জোসেফিন অ্যালিকগ ও শ্রিয়ানি মারিয়ান ফার্নান্দো শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, পাঁচ মাস হোটেলে আটকে রাখার অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু মজার বিষয়, সৌদি আরব দেশটি রাজার ভাই বলে হস্তক্ষেপ করে আমেরিকার কাছ থেকে প্রিন্স সাদের রাজকীয় দায়মুক্তি নিয়ে আসতে পেরেছিল। দেশে ফিরে এসে প্রিন্স সাদের ওপর তাজিয়া বিচারটি কতটুকু যুক্ত হয়েছিল, এর কোনো নথি অবশ্য পাওয়া যায় না।

আবার ২০১৫ সালে আল সৌদ বংশের প্রিন্স মাজেদ আবদুল আজিজ একজন নারীকে ধর্ষণচেষ্টা করলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সৌদি রাষ্ট্রের আইনজীবীর প্রসিকিউশনে প্রমাণ অপর্যাপ্ত দেখিয়ে ৩ লাখ ডলার দিয়ে তার জামিন কার্যকর করে। এই ঘটনাগুলো শুধু রাজকীয় দায়মুক্তিই না, অন্যদেশে গিয়ে অপরাধ করেও আন্তর্জাতিক নাগরিক হিসেবে সৌদি রাজাদের সুরক্ষা পাওয়ার ঘটনা। তার মানে সৌদি রাষ্ট্র জানে, আন্তর্জাতিক নাগরিককে সুরক্ষা কিভাবে দিতে হয়! নিজ দেশে অভিবাসী শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রেই সেই সুরক্ষার বিষয় তারা মানে না।

এই যে এত হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের জীবন অনিরাপদ, তবুও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৌদিতে এই বিপুল পরিমাণ শ্রমিক কেন পাঠায়? কেন শ্রমিকের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায়হীনতা দেখায়? কেন রাষ্ট্রের বন্দোবস্ত দেশের শ্রমিকের বুকে গুলি আর অভিবাসী শ্রমিককে ‘মেরে ফেলা’তেই নিয়োজিত? সস্তা শ্রমের বিনিময়ে রাষ্ট্রের মুনাফা লাভের বিপরীতে শ্রমিকের লাশ হওয়ার নামই কি জনশক্তি বিনিয়োগ? প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে নারীর ক্ষমতায়ন?

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী কেবল ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫২ হাজার শ্রমিক সৌদিতে গিয়েছে। সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কর্মরত আছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন মাসেই বাংলাদেশে মোট ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাঠিয়েছেন এই অভিবাসী শ্রমিকরা।

ভিয়েনা কনস্যুলার সম্পর্ক বিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী, বিদেশে গ্রেফতার হলে বা আইনি জটিলতায় পড়লে নিজ দেশের কনস্যুলার প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার রয়েছে। অনির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সস্তা মজুরি আর নিপীড়ন শ্রম পরিবেশের বিনিময়ে এই দেশের বড় অংশের অদক্ষ নারীর গৃহকর্ম সৌদিতে বিক্রয়যোগ্য। নিজেদের অধিকার, কূটনৈতিক সুরক্ষা কিংবা আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হওয়া তো দূরের কথা! অথচ বাংলাদেশের রাষ্ট্র এই অদক্ষ শ্রমশক্তিকে মূলত রেমিট্যান্সের অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করে। রাষ্ট্রের কাছে তাদের শ্রমের মূল্য আছে, কারণ সেই শ্রম বৈদেশিক মুদ্রা আনে। তবে সেই শ্রমিকের জীবন, নিরাপত্তা, সুস্থতা কিংবা মর্যাদাপূর্ণ শ্রমপরিবেশ রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে। এইটাই রাষ্ট্রীয় বায়োপাওয়ারের নির্মম বাস্তবতা,যেখানে শ্রমিকের শরীর মুনাফা উৎপাদনের সম্পদ। কিন্তু তার বেঁচে থাকা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের বিষয় নয়।

সৌদি আরব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেও দেশটি স্বাক্ষরকৃত না। যে দেশের সাথে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা নেই, সেই দেশে বাংলাদেশ কেন জনশক্তি বিনিয়োগ করে? বাংলাদেশের যে শ্রমিক নিজের শ্রম বিক্রি করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন, বিদেশের মাটিতে তার জীবন ও ন্যায়বিচারের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? কেন শ্রীলঙ্কা তার নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড এড়াতে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খুঁজতে পারে, অথচ বাংলাদেশ পারে না? ইন্দোনেশিয়া যদি শ্রমিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিতে সৌদি আরবে ১০ বছর কর্মী পাঠানো বন্ধ রেখে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তবে বাংলাদেশকেন পারে না?

প্রশ্নটা চুম্বন পাপ না পুণ্য, তা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা মসজিদে চুম্বন নৈতিক না অনৈতিক, তা নিয়েও নয়। প্রশ্নটা হচ্ছে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ঘিরে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে—যেখানে মৃত্যুর ঝুঁকি শ্রমিকের, অথচ তাদের শ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স ভোগ করে রাষ্ট্র।

সৌদি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় ক্ষমতা, শ্রেণি ও নাগরিকত্বের বৈপরীত্য ব্যবস্থার প্রশ্নকে সরিয়ে যারা কেবল, মসজিদে চুমুর মধ্যে ঘটনাটিকে দেখতে চান, তারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকেই বৈধতা দেন। তাদের চোখে চুম্বন অশ্লীল, কিন্তু শ্রেণিশোষণ, বিচারিক বৈষম্য আর শ্রমিকের মৃত্যু, সবই যেন পুণ্য! যেমন- এই দেশের বিএনপির মুন্সীগঞ্জ আসনের এমপি কামরুজ্জামান বলেছেন, এই পাপের লাশ তিনি চান না বাংলাদেশে আসুক। কিন্তু দুজন পাপী শ্রমিকের রেমিট্যান্স ঢুকেছে এই দেশে। সার্কুলেট হয়েছে অর্থনীতি। কামরুজাজামান এই পাপীদের রেমিট্যান্স আলাদা করতে পারবে কি? ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে গড়ে প্রতিদিন চারটিরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। এই মৃত্যুর রাজনীতি অশ্লীলতা, অনৈতিকতা কিংবা পাপের বয়ান দিয়ে নির্মিত হয়নি; নির্মিত হয়েছে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তাকে গৌণ করে দেখা রাষ্ট্রীয় নীতি ও শ্রেণিশোষণের  মধ্য দিয়ে।

বিমানে আসা অজস্র কফিনের সামনে নজরুল ও সিতির ঘটনায় মসজিদে চুম্বন কেন্দ্র করে পাপ-পুণ্যের বিচার বসানো কিংবা ‘ওই দেশের আইন মানা কর্তব্য’ বলে সব দায় শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আসলে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ঘিরে রাষ্ট্রীয় নেক্রোপলিটিক্সের প্রশ্নকে আড়াল করার চক্রান্তই।

লেখক:  সদস্য, রেড ফেমিনিস্ট ব্লক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/১৯.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

ক্ষমতা বদলায়, রাষ্ট্র কি বদলায়?
১৯ অক্টোবর ২০২৬

ক্ষমতা বদলায়, রাষ্ট্র কি বদলায়?

মীর আরিফ হোসেনবাংলাদেশে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস বদলেছে, মানুষের প্রত্যাশাও বারবার নতু...

ড. ইউনূস কাণ্ড ও আওয়ামী অধিকার চর্চা
১৮ অক্টোবর ২০২৬

ড. ইউনূস কাণ্ড ও আওয়ামী অধিকার চর্চা

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুআওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যখন যা করেন সব তাদের ন্যায্য অধিকার বিবেচনায় করেন। ড. ইউ...

দুর্গাপূজা: আনন্দ, সম্প্রীতি ও মানবতার উৎসব
১৭ অক্টোবর ২০২৬

দুর্গাপূজা: আনন্দ, সম্প্রীতি ও মানবতার উৎসব

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডেশরৎ এলেই প্রকৃতিতে দেখা দেয় এক সুন্দর পরিবর্তন। নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল আর শ...

দেবীর আরাধনা বনাম ঘরের নারীর অবহেলা
১৭ অক্টোবর ২০২৬

দেবীর আরাধনা বনাম ঘরের নারীর অবহেলা

চিররঞ্জন সরকারহিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়েই এবার দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। জগন্না...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বের কোথাও নেই: রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বিশ্বের অন্য কোথাও নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, বিশ্বজুড়ে যখন হানাহানি ও হিংসার আগুন জ্বলছে, তখন বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারছেন। রোববার (১৮ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গোৎসব ও বিজয়া দশমী ২০২৬ উপলক্ষ্যে ঢাকার রমনা কালীমন্দির পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 19 ঘন্টা আগে