জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে দায়িত্বে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি বিভিন্ন সময়ে অসংলগ্ন কথা বলেছেন এবং দায়িত্ব পালনে ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্কার ইস্যুতেও তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণামূলক কথা বলেছেন বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক নেই - বিষয়টি এখন জনগণের সামনে স্পষ্ট। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রেখে তা সম্ভব নয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির উদাহরণ হিসেবে মিরপুরের রাড্ডা সেন্টার ও কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, বিএনপির নেতাকর্মীদের দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির যে ধারাবাহিকতার কথা তিনি বলে আসছেন, সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
রাড্ডা সেন্টার ভাঙচুরের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাতের আঁধারে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সেখানে ভাঙচুর চললেও প্রশাসন তা বন্ধ করতে পারেনি। তাঁর অভিযোগ, সরকারি ইন্ধন, রাষ্ট্রীয় মদদ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ মদদ ছাড়া রাজধানীতে এভাবে ভাঙচুর চালানো সম্ভব নয়।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, সেখানে স্পষ্টভাবে ভাঙচুর ও একটি ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। প্রশাসন ঘটনাটি প্রতিরোধ বা বন্ধ করতে পারেনি। পরে কারা হামলা করেছে কিংবা ভুক্তভোগীর দায় কী - এসব প্রশ্ন তুলে সরকার বিষয়টি অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, রাড্ডা সেন্টার ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ঘটনা গণমাধ্যমে আসায় রাজধানীর এসব ঘটনা মানুষের সামনে এসেছে। কিন্তু সারাদেশের পরিস্থিতিও একই রকম। তাঁর ভাষ্য, হবিগঞ্জে সিএনজি বা অটোরিকশা স্ট্যান্ড দখল নিয়ে ব্যাপক মারামারি এবং সাভারে মাদরাসা দখলের চেষ্টার মতো ঘটনাও ঘটছে। সারাদেশে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সমালোচনা: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণ নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ওই ভাষণে জনগণের প্রত্যাশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা যথাযথভাবে উঠে আসেনি।
নাহিদ ইসলামের দাবি, ভাষণে দলীয় ইশতেহার ও ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এসব প্রকল্প দেশে ইতোমধ্যে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি এবং দলীয় লোকজনকে কার্ড দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
তাঁর মতে, এসব বিষয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমালোচনার বিষয় হতে পারে, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের যে বিষয়গুলো তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল, সেগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি জাতিসংঘে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে অভিযোগ করেন নাহিদ। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে সংকট তৈরি হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে যে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, সে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আরো জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। পারস্য উপসাগর থেকে বাংলাদেশে জাহাজে জ্বালানি আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সতর্কবার্তা: সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনটি দফায় দফায় পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না কিংবা নির্বাচন প্রকৌশলের মাধ্যমে ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে - এমন ন্যূনতম আশঙ্কা তৈরি হলেও জাতীয় নির্বাচনের মতো দেশের স্থিতিশীলতার কথা ভেবে তাঁরা নীরব থাকবেন না। সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে আপত্তি: সংবিধান সংশোধনী কমিটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, সংশোধনের নামে সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে ধুলিসাৎ করার চেষ্টা চলছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, তাঁরা রাষ্ট্রের কসমেটিক সার্জারি চান না, চান মৌলিক সংস্কার। এর আগে ১৭ বার সংবিধান সংশোধন হলেও মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি করে তিনি দ্রুত এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের দাবি জানান।
প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় অনেক চাকরিপ্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগ তুলে বিভিন্ন জেলায় আন্দোলন করছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রায় আড়াই হাজার চাকরিপ্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তাঁর দাবি, বাদ পড়াদের অধিকাংশেরই কোনো ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া অনেক সহযোদ্ধাকেও বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি এসব চাকরিপ্রার্থীর পাশে থাকবে। কোনো চাকরিপ্রার্থীকে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলে তাঁর পক্ষে তাঁরা লড়বেন।
সংবাদ সম্মেলনে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ জাতীয় নাগরিক পার্টির সর্বোচ্চ পরিষদ রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/২৮/৯/২০২৬