কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ মানবজাতির জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও দানশীল বিল গেটস। তাঁর মতে, সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্মুক্তভাবে বিকশিত হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যার পরিণতি হতে পারে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে সঞ্চালক ক্রিস্টেন ওয়েলকারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গেটস মার্কিন আইনপ্রণেতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ওপর অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে এই প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলা করা যথেষ্ট নয়।
গেটসের ভাষায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন শক্তিশালী প্রযুক্তি, যা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে মানব ইতিহাসে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ অস্ত্রগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি কীভাবে হবে, সে বিষয়ে আইনপ্রণেতা ও রাজনীতিবিদদের আলোচনায় বসতে হবে এবং এ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
তবে তাঁর মতে, এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ শিল্পের ওপর অসহনীয় বোঝা তৈরি করবে না। বরং এটি ব্যবসা পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয়ের মতো কিছু খরচ বাড়াবে, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের কাজের গতি নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেবে না।
আগস্টের শেষদিকে প্রকাশিত প্রায় ছয় হাজার শব্দের এক নিবন্ধেও গেটস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলো এমন একটি প্রযুক্তি মোকাবিলার জন্য তৈরি নয়, যা অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন প্রয়োগ, অর্থনীতি, জ্বালানি, নির্বাচন ও জাতীয় নিরাপত্তাসহ সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করছে।
গেটসের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কেবল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সামাজিক নেতৃত্বের অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এর ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারে জৈব অস্ত্র তৈরি কিংবা পারমাণবিক যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কার কথাও বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ তাত্ত্বিকভাবে তুলে ধরেছেন। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় যথাযথ নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রযুক্তি অঙ্গনেও আলোচনা বাড়ছে।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে মাইক্রোসফটের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ‘নো অ্যাজিউর ফর আপারথাইড’ সংগঠনের মোহাম্মদ হুসেন ও গ্রানাতে কিম দাবি করেছেন, মাইক্রোসফটের কর্মীরা প্রতিষ্ঠানটিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী এবং ইরানে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিবন্ধটির লেখকেরা আরো দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ অভিবাসীদের সার্বক্ষণিক নজরদারি, গ্রেফতার ও নির্বাসনের মতো কাজে মাইক্রোসফটের অ্যাজিউরের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।
এদিকে জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের পর জনসমক্ষে বিল গেটসের বড় উপস্থিতির মধ্যে আগস্টের নিবন্ধ এবং রোববারের সাক্ষাৎকারটি অন্যতম। ২০০৮ সালে নাবালিকাদের যৌনপেশায় যুক্ত করার দায়ে এপস্টেইন দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এর ১১ বছর পর কারাবন্দী অবস্থায় আত্মহত্যা করেন তিনি।
গেটসের দাতব্য সংস্থার উদ্যোগে পরিচালিত এবং জুলাইয়ে প্রকাশিত এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এপস্টেইনের সঙ্গে প্রায় ৩০টি বৈঠকে অংশ নেওয়া সংস্থাটির কর্মকর্তা ও নেতাদের মধ্যে গেটসও ছিলেন। তবে এপস্টেইনের অপরাধে জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ গেটসের বিরুদ্ধে ওঠেনি। তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে কাটানো সময়ের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে তিনি গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গেও প্রশ্ন করা হয় গেটসকে। জবাবে তিনি হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন না। পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট বলেও জানান। তাঁর কথায়, তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কোনো সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলেননি।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৮/৯/২০২৬