রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কোনো নিশ্চয়তা। এতে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে শত শত কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং স্থবির হয়ে পড়ছে নগরজীবনের গতি।
বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। কেউ আগের রাত থেকে, কেউ ভোর থেকে আবার কেউ সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তবুও তেল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা ফেরাতে পরীক্ষামূলকভাবে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। নিবন্ধনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা একটি কিউআর কোড পাচ্ছেন, যা নির্দিষ্ট পাম্পে স্ক্যান করে তেল নেওয়া যাচ্ছে। এ ব্যবস্থায় ফুয়েল পাসধারীরা সর্বোচ্চ এক হাজার টাকার তেল পেলেও সাধারণ ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ পাঁচশ টাকার জ্বালানি।
রায়েরবাজারের বাসিন্দা আতাউর রহমান ভোরে তেল নিতে বের হয়ে শাহবাগ এলাকায় দীর্ঘ লাইনে আটকা পড়েন। ডিপো থেকে সরবরাহ না আসায় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত তেল বিতরণ শুরু হয়নি। পরে বেলা সোয়া ১১টার দিকে সরবরাহ শুরু হলেও তখনও তিনি লাইনে অপেক্ষমাণ ছিলেন। অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সকালে বের হলেও দুপুরে কাজে যেতে পারবেন কি না, তা নিশ্চিত নন।
নীলক্ষেত, কাঁটাবন, ঢাকা কলেজ ও শাহবাগ এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘ লাইনের কারণে সড়কের অংশ দখল হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। লালবাগের বাসিন্দা মাইনুল হোসেন জানান, একাধিক পাম্প ঘুরেও তেল না পেয়ে আবার লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে, গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
ঢাকা-গাজীপুর রুটের এক বাসচালক বলেন, তেল না পাওয়ায় নিয়মিত বাস চালানো যাচ্ছে না, ফলে আয় কমে গেছে। একইভাবে অ্যাম্বুলেন্সচালকরা জানাচ্ছেন, সংকটের কারণে দূরের পথে রোগী নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও সিএনজি গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত—বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এর প্রভাবে দেশে ডিপো থেকে সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। সময়মতো ও পর্যাপ্ত জ্বালানি না আসায় পাম্পগুলো গ্রাহকদের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মঘণ্টা নষ্ট, পরিবহন ব্যাহত, জরুরি যানবাহন আটকে পড়া, যানজট বৃদ্ধি এবং গরমে অসুস্থতার মতো বহুমাত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমে যাবে, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। স্বাস্থ্যসেবাসহ জরুরি সেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, এই সংকট বৈশ্বিক প্রভাবের অংশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ মজুত ও উচ্চমূল্যে বিক্রি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জনভোগান্তি আরও বাড়বে এবং অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব গভীরতর হবে।
এসি/আপ্র/১৫/০৪/২০২৬