গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

প্রবাসীর শিরচ্ছেদ-সাড়ে সাত হাজার বন্দি, রাষ্ট্রের অবস্থান কী?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৪৬ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৫৯ এএম ২০২৬
প্রবাসীর শিরচ্ছেদ-সাড়ে সাত হাজার বন্দি, রাষ্ট্রের অবস্থান কী?
ছবি

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন

বিদেশের কারাগারে একজন বাংলাদেশি বন্দি থাকবেন, তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত সাজা কার্যকর হবে, অথচ তাঁর নিজের রাষ্ট্র আগাম কিছুই জানতে পারবে না—এ কেমন কূটনৈতিক সম্পর্ক, এ কেমন নাগরিক সুরক্ষা? সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের ঘটনায় এই প্রশ্ন এখন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ নিজের নাগরিকের জীবন, ন্যায়বিচার ও অধিকার রক্ষার দায়িত্ব বিসর্জন দেওয়া নয়। কূটনৈতিক সৌজন্য নাগরিকের নিরাপত্তার বিকল্প হতে পারে না। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশের নাগরিকের জীবনসংক্রান্ত গুরুতর ঘটনায়ও দৃঢ়ভাবে জবাব চাইতে হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কারা কী অভিযোগে আটক, কার মামলা কোন পর্যায়ে, কে কী দণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন—এসব তথ্য কতটা হালনাগাদ এবং নিয়মিত তদারকির আওতায়, তা এখন প্রকাশ্যে স্পষ্ট করা জরুরি। সম্প্রতি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর তাঁদের শিরচ্ছেদ করা হয়। অথচ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে জানানো হয়নি। ঘটনার পর রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে, কনস্যুলেট চিঠি দিয়েছে, সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আলোচনার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নাগরিকের জীবন চলে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের তৎপরতা শুরু হলে সেই তৎপরতার কার্যকারিতা কোথায়?

সৌদি আরবের নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কোনো বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের আগে তাঁর দেশকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা কী, সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও কূটনৈতিক রীতিতে কী বিধান রয়েছে, তা যাচাই করে বাংলাদেশকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। দুই বাংলাদেশির গ্রেফতার, বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনজীবী নিয়োগ, আপিল এবং কনস্যুলার যোগাযোগের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাইতে হবে। তাঁরা কারাগারে থাকার সময় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশন কী করেছে, কখন জেনেছে এবং কী সহায়তা দিয়েছে—তারও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন। দায়িত্বে অবহেলা থাকলে দায় নির্ধারণ করতে হবে। শুধু আগের সরকার বা বর্তমান সরকারের পূর্ববর্তী সময়ের দিকে আঙুল তুলে বর্তমানের দায় এড়ানো যাবে না।

এখনই সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে বন্দি বাংলাদেশিদের পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তালিকা তৈরি করতে হবে। প্রত্যেক বন্দির মামলার অবস্থা, দণ্ড, আপিলের সুযোগ ও আইনি সহায়তার প্রয়োজন নথিভুক্ত করে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়তে হবে। মৃত্যুদণ্ড ও গুরুতর দণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মামলা অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যালোচনার জন্য বিশেষ কনস্যুলার দল গঠন করা প্রয়োজন। গ্রেফতারের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্দির সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দূতাবাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়নেও বন্দিদের মামলা তদারকির বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে।

প্রবাসীদের সুরক্ষা নিয়ে শুধু আশ্বাস নয়, পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং অগ্রগতির হিসাব প্রকাশ করতে হবে। দূতাবাসের অবহেলা প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারণামূলক নিয়োগ, ভুয়া কাগজপত্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশযাত্রায় প্ররোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ইউরোপের ইতালি, গ্রিস ও সাইপ্রাস থেকে সম্প্রতি ৩৫ বাংলাদেশির ফেরত আসা দেখায়, অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রতিরোধ, পুনর্বাসন ও বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।

প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ নন; তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, তাঁদের পাঠানো অর্থে অসংখ্য পরিবার বেঁচে থাকে। অথচ বিপদের সময় তাঁরা যদি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন, তবে নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখেই বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে জবাব চাইতে হবে। প্রবাসীর জীবন বিপন্ন হওয়ার পর শোক প্রকাশ নয়, বিপদের আগেই রাষ্ট্রের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কূটনীতি যদি নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে না পারে, তবে সেই কূটনীতির কার্যকারিতা ও জবাবদিহি—দুটিই নতুন করে পর্যালোচনার সময় এসেছে।
সানা/আপ্র/২৫/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

রক্তাক্ত খুলনায় জননিরাপত্তার এমন বিপর্যয় আর কত দিন
২৪ অক্টোবর ২০২৬

রক্তাক্ত খুলনায় জননিরাপত্তার এমন বিপর্যয় আর কত দিন

খুলনা কি ক্রমেই খুন-খারাবির নগরীতে পরিণত হচ্ছে? এক দিনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গুলি করে যুবক ও গৃহবধূক...

ডিজে পার্টিসহ মাদক ব্যবসায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করুন
২২ অক্টোবর ২০২৬

ডিজে পার্টিসহ মাদক ব্যবসায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করুন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার বাসায় ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক সেবন, মাদক ব্য...

প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পূজামণ্ডপ সফর: সমানাধিকারের বার্তা
২২ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পূজামণ্ডপ সফর: সমানাধিকারের বার্তা

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার প্রশাসনিক কর্তৃত্বে নয়, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার ন...

সড়কে অপরাধীদের দাপট, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায়?
২১ অক্টোবর ২০২৬

সড়কে অপরাধীদের দাপট, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায়?

রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া। অথচ দেশের বিভিন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই