টানা অঝোর বর্ষণে রাজধানী ঢাকা রোববার কার্যত জলাবদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছে। শনিবার (১১ জুলাই) গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে রোববার (১২ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় রাজধানীতে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি মাসে এ সময়ের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় মোট ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, জিগাতলা, সায়েন্সল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মণিপুর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মতিঝিল, খিলগাঁও, বনানী, খিলক্ষেত, মালিবাগ, মৌচাক ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়কে হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে যায়।
অনেক এলাকার অলিগলিও পানিতে ডুবে যাওয়ায় ঘর থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে কর্মস্থলে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে। জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও পানিতে গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সড়কে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।
অফিসগামী ও শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি: সকালে কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে দুর্ভোগে পড়েন হাজারো মানুষ। গণপরিবহন সংকটের পাশাপাশি রিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেন যাত্রীরা।
মিরপুরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান জানান, তিনি মোটরসাইকেলে বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের দিকে যাওয়ার সময় সড়কে জমে থাকা পানিতে আটকে যান। পানির কারণে তার মোটরসাইকেল বিকল হয়ে পড়ে। পরে বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল ঠেলে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয় তাকে।
জিগাতলার বাসিন্দা সাব্বির আহমেদ বলেন, হাঁটুপানির কারণে বাসা থেকে বের হয়ে বাসস্ট্যান্ডে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও রিকশা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভ্যানে করে পানি পার হয়ে তাকে কর্মস্থলে যেতে হয়েছে।
বাড়তি ভাড়ার ক্ষোভ: বৃষ্টির কারণে রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। মিরপুরের এক বাসিন্দা জানান, স্বাভাবিক সময়ে যে পথে ৩০ থেকে ৪০ টাকা ভাড়া লাগে, সেখানে বৃষ্টির কারণে রিকশাচালকরা ১০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করছেন।
জিগাতলার বাসিন্দারাও একই অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, জলাবদ্ধতার সুযোগে অনেক চালক অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন, যা কর্মজীবী মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিজয় সরণি মোড় এলাকায় রোববার সকালের চিত্র --ছবি সংগৃহীত
বিপাকে যানবাহন চালকরাও: জলাবদ্ধতায় শুধু যাত্রীরাই নন, দুর্ভোগে পড়েছেন যানবাহন চালকরাও। অটোরিকশা ও সিএনজিচালকরা জানান, পানিতে চলাচল করতে গিয়ে অনেক সময় গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে দিনের আয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে মেরামত খরচ।
এক অটোরিকশাচালক বলেন, বৃষ্টির দিনে আয় বাড়বে ভেবে গাড়ি নিয়ে বের হলেও পানিতে ডুবে গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উল্টো ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
স্থগিত হয়েছে কয়েকটি পরীক্ষা: জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
শেওড়াপাড়ার মণিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের একটি শাখার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এ ছাড়া ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের বেইলি রোড শাখায় নবম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক, দশম শ্রেণির প্রাক্-নির্বাচনী এবং একাদশ শ্রেণির ব্যবহারিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
গ্রিন রোডের ওয়াইডব্লিউসিএ উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ও শংকরের নালন্দা স্কুলেও জলাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি শ্রেণির পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও: টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরও। সবজি বিক্রেতা, ভ্যানচালক ও ছোট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ায় তাদের বেচাকেনা কমেছে।
মিরপুর এলাকার এক সবজি বিক্রেতা বলেন, বৃষ্টির কারণে ভ্যান নিয়ে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রেতারাও ঘর থেকে কম বের হওয়ায় ব্যবসা কমে গেছে।
ভারী বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকার আভাস: আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরো বৃষ্টি হতে পারে। রোববার ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে এলে ধীরে ধীরে জলাবদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর ভারী বৃষ্টিতে একই ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনো হয়নি।
জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় নগরবাসীর সহযোগিতা চাইল ডিএনসিসি: অতিভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় নগরবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
রোববার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে তিনি এ আহ্বান জানান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টানা বৃষ্টির কারণে ডিএনসিসির আওতাধীন মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অতিবৃষ্টির ফলে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় কোথাও কোথাও মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
প্রশাসক নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজ নিজ এলাকার জলাবদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং জরুরি কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ডিএনসিসি জানায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে এরই মধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ড্রেন, নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। যেসব এলাকায় পানি জমেছে, সেখানে দ্রুত পানি অপসারণে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াটার পাম্প সচল রাখা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, দ্রুত নগরায়ণের কারণে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া, খাল ও ড্রেন সংকুচিত হওয়া, অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা এবং পুরোনো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত খাল-নালা পরিষ্কার এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আকস্মিক অতিভারী বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নগরবাসীর সহযোগিতা অপরিহার্য।
সানা/আপ্র/১২/৭/২০২৬