গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

চুল কাটতে বের হওয়া রায়হান ফিরলো এক পা ও কিডনি হারিয়ে

জেলা প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

জেলা প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১৩:০৬ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০১:৫৪ এএম ২০২৬
চুল কাটতে বের হওয়া রায়হান ফিরলো এক পা ও কিডনি হারিয়ে
ছবি

ছবি সংগৃহীত

মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। সাত মাস পর যখন বাড়ি ফিরেছে, তখন তার ডান পা নেই। পেটের ডান পাশে ও পিঠে রয়েছে অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ দাগ। ঢাকার একটি চক্র তাকে পঙ্গু করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করেছে এবং তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করছে পরিবার।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে রায়হান। গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঐতিহ্যবাহী চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে চিনতে পারেন। খবর পেয়ে বাবা সেখানে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রায়হান জানায়, চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজার চলে যায়। সেখানে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে যায়। সেখান থেকে কয়েকজন তাকে চারপাশে বাগান ও মাঝখানে একটি ঘর রয়েছে—এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে তার মতো আরো অনেক ছেলে-মেয়ে ছিল।

রায়হানের ভাষ্য, এক রাতে সেখানে ঘুমানোর পর সকালে উঠে সে দেখতে পায় তার একটি পা নেই। কারণ জানতে চাইলে সেখানে থাকা লোকজন তাকে বলে, সে নাকি ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। এরপর প্রতিদিন তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করানো হতো। ভিক্ষার টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো।

রায়হান আরো জানায়, সেখানে দুইজন পুরুষ ও সালমা নামের এক নারী ছিল। অনেকেরই হাত-পা কাটা ছিল। একপর্যায়ে তাকে বাসে তুলে দেওয়া হলে সে চুনতির সীরাত মাহফিল এলাকায় চলে আসে।

রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, রায়হান হেফজখানায় পড়ত। একটু দুষ্টুমি করত বলে তাকে মাঝেমধ্যে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতেন। ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে পাঠানোর পর সে কক্সবাজার চলে যায়। পরে তাকে কমলাপুরে নিয়ে গিয়ে এক পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয়েছে বলে ছেলের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন।

তিনি বলেন, সীরাত মাহফিলে একজন লোক রায়হানকে দেখে খবর দিলে সেখানে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে অভাবের কারণে ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে পারেননি।

নাজিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, রায়হান ফিরে আসার পর লোহাগাড়া থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে চাইলেও তা নেওয়া হয়নি। তাকে বলা হয়, ঘটনাটি কমলাপুরে ঘটেছে, তাই সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করতে হবে। ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করার সামর্থ্য তার নেই বলেও জানান তিনি।

রায়হানের সৎমা ফয়জুন্নেসা বলেন, সাত মাস পর ছেলেকে ফিরে পেলেও তার একটি পা নেই। পেটেও বড় কাটার দাগ রয়েছে। কারা তার নিষ্পাপ শিশুর এমন অবস্থা করেছে, তাদের বিচার দাবি করেন তিনি।

সীরাত মাহফিলে রায়হানকে প্রথম দেখতে পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, রাত ১২টার পর মাহফিলের ভিড়ের মধ্যে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখেন। মুখটি পরিচিত মনে হওয়ায় কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করলে শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে নিজের পরিচয় দেয়। এরপর তিনি বুঝতে পারেন, সাত মাস আগে নিখোঁজ হওয়া নাজিম মিয়ার ছেলে রায়হান এটি। পরে তার বাবাকে ফোন করে খবর দেওয়া হয়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, রায়হানের পরিবার দরিদ্র ও সাধারণ। ১২ বছরের শিশুটির সঙ্গে যে বর্বরতা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

মানবাধিকারকর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদী বলেন, শিশুটিকে দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি চক্র তার জীবন বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। ঘটনার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তবে থানায় আইনি সহায়তা না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক। তারা জানান, রায়হান সাত মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হলেও তার পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করেনি।

পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে, রায়হান প্রায় এক মাস কক্সবাজারে ছিল। পরে তাকে কমলাপুরে নেওয়া হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে রায়হান নিখোঁজ থাকার সময়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট নির্মাতা তার একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ওই ভিডিওতে রায়হানকে বলতে দেখা যায়, জায়গা-সংক্রান্ত মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমা তাকে মারধর করায় সে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় এসেছে। তবে স্বজনদের দাবি, ভয় দেখিয়ে বা কারও শেখানো কথায় শিশুটি ভিডিওতে এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে।

মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, গত সাত মাসে দেশে প্রায় ১৪ হাজার শিশু এভাবে নিখোঁজ হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। তাদের ধারণা, একটি চক্র শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়ার মতো অপরাধে জড়িত থাকতে পারে। এ বিষয়ে দ্রুত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ। তাদের অধিকাংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার চক্রের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত শনাক্তে জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা দেশব্যাপী কার্যকর করা এবং সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরিরও দাবি জানান তিনি।

এসি/আপ্র/১৪/০৯/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

সেতুর বাইপাস থেকে মোটরসাইকেলসহ সবুজের লাশ উদ্ধার
২৯ অক্টোবর ২০২৬

সেতুর বাইপাস থেকে মোটরসাইকেলসহ সবুজের লাশ উদ্ধার

সুজাউদ্দৌলা সুজন, জামালপুর: সড়কের একদিকে মোটরসাইকেল, আরেকদিকে পড়ে থাকা এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে...

এমএফসের অপব্যবহার তদন্ত ও প্রতিরোধ বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত
২৯ অক্টোবর ২০২৬

এমএফসের অপব্যবহার তদন্ত ও প্রতিরোধ বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত

এস এ খান শিল্টু মেহেরপুর: মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফস) অপব্যবহার তদন্ত ও প্রতিরোধ বিষয়ক স...

সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী আহত, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি
২৯ অক্টোবর ২০২৬

সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী আহত, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি

টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার ছুটির পর সড়ক প...

দিনব্যাপী নিরাপদ অভিবাসন, মানব পাচার বিষয়ে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন
২৯ অক্টোবর ২০২৬

দিনব্যাপী নিরাপদ অভিবাসন, মানব পাচার বিষয়ে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন

মাদারীপুর প্রতিনিধি: মাদারীপুর এ ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রকল্পের আয়োজনে ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর অর্থায়নে ২৯...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে