গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

বাংলাদেশে গ্যাং পরিচালনার নেতৃত্বে থাকা ইমনের আধার কার্ডে নাম ছিল আজাহার

জেলা প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

জেলা প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১৯:৩৫ পিএম, ৩০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৩:২০ এএম ২০২৬
বাংলাদেশে গ্যাং পরিচালনার নেতৃত্বে থাকা ইমনের আধার কার্ডে নাম ছিল আজাহার
ছবি

চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্যাংয়ের বাংলাদেশ অংশের মূল নেতৃত্বে ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন -প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্যাংয়ের বাংলাদেশ অংশের মূল নেতৃত্বে ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। ভারতে অবস্থানরত গ্যাং প্রধান সাজ্জাদের হয়ে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন তিনি। এমন দাবি করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।

দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা ডেভিড ইমনকে গ্রেফতারের পর তার অপরাধ নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের উৎস, চাঁদাবাজির অর্থের প্রবাহ, সহযোগীদের ভূমিকা এবং দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।

বাংলাদেশে গ্যাং পরিচালনায় নেতৃত্বে ইমন: পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্যাংয়ের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন সাজ্জাদ। তবে তিনি দেশের বাইরে থাকায় বাংলাদেশে গ্যাংয়ের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন ডেভিড ইমন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে পুরো গ্যাংয়ের লিডার বলা যায় ডেভিড ইমনকে। তার পরের অবস্থানে থাকা রায়হানও পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে।”

এসপি বলেন, পুলিশের কাছে কে কার প্রতিপক্ষ বা কোন গ্রুপের সদস্য, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আধার কার্ডে পরিচয় ‘আজাহার খান’
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারের সময় ডেভিড ইমনের কাছ থেকে ভারতের একটি আধার কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। ওই কার্ডে তার নাম ‘আজাহার খান’ উল্লেখ রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন ইমন। এ জন্য ভারতে তার পরিচয় পরিবর্তনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। বড় সাজ্জাদের পরামর্শেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং সীমান্তের ওপারে তাকে গ্রহণের জন্য লোকজন প্রস্তুত ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

চেহারা বদলে পালানোর চেষ্টা
পুলিশ জানায়, গ্রেফতার এড়াতে নিজের চেহারায় পরিবর্তন এনেছিলেন ডেভিড ইমন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা ছবিতে তাকে গোঁফসহ দেখা গেলেও গ্রেফতারের পর প্রকাশিত ভিডিওতে তাকে গোঁফ ছাড়া দেখা গেছে।

এসপি মাসুদ আলম বলেন, চেহারা, চুল ও দাড়ির ধরন পরিবর্তন করে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। তবে দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

যশোরে যৌথ অভিযানে গ্রেফতার
পুলিশ জানায়, গত বুধবার ভোরে নড়াইল-যশোর সড়কের ঝুমঝুম এলাকায় যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে ডেভিড ইমনকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয়।

এসপি বলেন, পুলিশের অভিযানের মুখে সহযোগীদের নিয়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যশোরে যান ইমন। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি বলেন, এটি কোনো আকস্মিক অভিযান ছিল না। কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। প্রথমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে কুমিল্লায় তাকে আটকের চেষ্টা করা হয়। পরে খুলনার উদ্দেশে যাওয়ার পথে পদ্মা সেতু এলাকা, গোপালগঞ্জ ও নড়াইল এলাকায় অভিযান চালানো হলেও তিনি ধরা পড়েননি। শেষ পর্যন্ত যশোর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

১৩ মামলার আসামি ইমন
সংবাদ সম্মেলনে ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে থাকা মামলার তথ্য তুলে ধরে পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশের অপরাধ ব্যবস্থাপনা তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে ১৩টি মামলা রয়েছে।

এর মধ্যে সাতটি হত্যা মামলা। বাকি মামলাগুলো চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

তিনি জানান, ডেভিড ইমনসহ গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে ফটিকছড়ি থানায় মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হবে। পাশাপাশি পুরোনো একটি ফটিকছড়ি থানার মামলায় রিমান্ড আবেদন করা হবে।

কৃষক পরিবারের সন্তান থেকে অপরাধ জগতে
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোবারক হোসেন ইমন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বড় পরিসরে পরিচিত ছিলেন না।

কৃষক পরিবারের সন্তান ইমন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে অপর সন্ত্রাসী রায়হানের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের গ্রুপে যুক্ত হন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সহযোগী হিসেবে ইমন ও রায়হানের নাম সামনে আসে। বড় সাজ্জাদের আরেক সহযোগী ছোট সাজ্জাদ ঢাকায় গ্রেফতার হওয়ার পর ইমন ও রায়হান ওই গ্রুপের নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠে আসেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

একের পর এক ঘটনায় নাম
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি আলোচিত অপরাধে ডেভিড ইমনের নাম এসেছে।

গত বছরের ২৯ মার্চ নগরীর চকবাজার থানার বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় ইমনের নাম আসে। ওই ঘটনায় দুজন নিহত হন। পরে গত বছরের ৩ নভেম্বর পাঁচলাইশের চালিতাতলী এলাকায় গুলিতে নিহত হন বাবলা।

এ ছাড়া গত বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে।

চলতি বছরের ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। এ মামলায় আসামিদের বেশির ভাগই ইমনের সহযোগী বলে পুলিশ জানিয়েছে।

গত ৮ মে নগরীর রৌফাবাদে হাসান রাজু হত্যাকাণ্ডেও বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।

এ ছাড়া ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং গত ১৩ জুলাই ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায়ও ইমনের সহযোগীদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

মহানগর ও জেলায় ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ডেভিড ইমন ও রায়হান নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

ইমন চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় এবং রায়হান জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বায়েজিদ, চকবাজার, চান্দগাঁও, বহদ্দারহাট ও রাউজানসহ কয়েকটি এলাকায় তাদের প্রভাব ছিল। তাদের কাছে আধুনিক অস্ত্র রয়েছে বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আগে রায়হানের সঙ্গে ২৫ থেকে ৩০ জন সশস্ত্র সহযোগী থাকলেও সাম্প্রতিক অভিযানের পর তার নেটওয়ার্ক অনেকটাই দুর্বল হয়েছে।

অস্ত্র ও চাঁদাবাজির অর্থের উৎস নিয়ে তদন্ত
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ইমনের গ্রুপ বিভিন্ন অপরাধ চালাত।

এ ছাড়া চাঁদাবাজির অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের কাছে পাঠানো হতো বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশ আরো বলছে, চাঁদাবাজির অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন তদবিরকারীর কাছেও পৌঁছে দেওয়া হতো। রায়হান চাঁদাবাজির অর্থ দিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি কিনেছেন বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

রাউজান ও জঙ্গল সলিমপুর পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ
রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এসপি মাসুদ আলম বলেন, চট্টগ্রামে যোগদানের পর জঙ্গল সলিমপুর ও রাউজানকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন।

তিনি বলেন, রাউজানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুরু থেকেই বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে পুলিশ। ভবিষ্যতেও অভিযান অব্যাহত থাকবে।

গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অপরাধীদের উত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৈরি হওয়া সাময়িক শূন্যতার সুযোগ অপরাধীরা নিয়ে থাকতে পারে।

পুলিশ জানায়, এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজিদ থানার একটি দস্যুতার মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন ডেভিড ইমন। তবে গ্রেফতারের ২২ দিনের মাথায় তিনি জামিনে মুক্তি পান।
সানা/আপ্র/৩০/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বন্ধুকে খুন করে মাটিচাপা, ওপর থেকে সিমেন্ট ঢালাই
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বন্ধুকে খুন করে মাটিচাপা, ওপর থেকে সিমেন্ট ঢালাই

পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে রাজধানীর লালবাগে ব্যবসায়ী বন্ধু শেখ ওয়াসিম রনিকে (৪৩) হত্যার পর লাশ মাট...

শাহজালালে ৭৪ ভরি স্বর্ণালংকারসহ আটক তিনজন
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শাহজালালে ৭৪ ভরি স্বর্ণালংকারসহ আটক তিনজন

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৭৪ ভরি স্বর্ণালংকারসহ চোরাচালান চক্রের তিন সদস্যকে...

কাপড়ের রোলের আড়ালে শাহজালালে মিলল ১,৬৫৫ মোবাইল
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাপড়ের রোলের আড়ালে শাহজালালে মিলল ১,৬৫৫ মোবাইল

হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট এলাকা থেকে কাপড়ের রোলের আড়ালে অবৈধভাবে আনা ১...

চাঁদা না দিলে ১০০ পুলিশ থাকলেও গুলি, চিকিৎসককে হুমকি
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চাঁদা না দিলে ১০০ পুলিশ থাকলেও গুলি, চিকিৎসককে হুমকি

চট্টগ্রামে এক চিকিৎসকের কাছে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ এবং তাঁর সহযোগী মো....

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই