সাতক্ষীরা রেঞ্জের পশ্চিম সুন্দরবনে প্রবেশকে কেন্দ্র করে পাঁচ বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দফায় দফায় ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বনজীবী জেলেদের নৌকা ও কাঁকড়া আহরণের অনুমতিপত্র বা পাস দেওয়ার সময় বিভিন্ন স্তরে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এতে জেলেরা একদিকে বনদস্যুদের চাঁদা, অন্যদিকে বন বিভাগের ঘুষ-দুই ধরনের চাপেই চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি চক্র গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তার অধীনস্থ বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ ফজলুল হক, কোবাদক স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ আনিসুর রহমান, কৈখালী স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ এবং কদমতলা স্টেশন কর্মকর্তা মনিরুল কবিরের বিরুদ্ধে এই ঘুষ বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জে চারটি স্টেশনের আওতায় প্রায় ২৯০০টির মতো বিএলসি রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০০টি মাছ আহরণ ও ১৪০০টি কাঁকড়া আহরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এসব পাস ও অনুমতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে নির্ধারিত নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন জেলেরা।
স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রেও অর্থের বিনিময়ে সুযোগ করে দেওয়া হয়। বুড়িগোয়ালিনী, কোবাদক, কৈখালী ও কদমতলা স্টেশনের অধীনে একাধিক টহল ফাঁড়ি রয়েছে। এসব ফাঁড়ির মাধ্যমে অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হলেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভয়ারণ্যের অন্তর্ভুক্ত মানিকচড়া, পান্তামারি, খাজুরদানা, পানির খাল, তালপটি, বালিঝাকি, ডিঙ্গিমারিসহ একাধিক এলাকায় জেলেদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও টাকার বিনিময়ে সেখানে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, খোলা বনে মাছ ও কাঁকড়া কম পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে অভয়ারণ্যে প্রবেশ করেন। কিন্তু সেখানে প্রবেশ করতেও বন বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরে অর্থ দিতে হয়। প্রতি নৌকা বা গোন অনুযায়ী বিভিন্ন হারে অর্থ আদায় করা হয় বলে তারা জানান। তাদের দাবি, নির্ধারিত পাস থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়।
আরো অভিযোগ রয়েছে, স্টেশন পর্যায় থেকে টহল ফাঁড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন নামে অর্থ আদায় করা হয়। ডিউটি খরচ ও লাইন খরচের নামে নৌকা প্রতি অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় বলে জেলেরা দাবি করেন। এসব অর্থের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, জেলেরা আরো জানান, অভয়ারণ্যে প্রবেশ করলে কখনো কখনো আটক করে পরে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তারা দ্বৈত চাপে পড়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
স্থানীয় জেলে রবিউল ইসলাম, নয়ন ও বাবুলসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, বনদস্যুদের পাশাপাশি বন বিভাগের অর্থ দাবির কারণে তারা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। মাছ ও কাঁকড়া বিক্রি করে অনেক সময় খরচই ওঠে না, তার ওপর ঘুষ ও চাঁদা পরিশোধ করতে হয়।
এ বিষয়ে সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ মশিউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভয়ারণ্যে কোনো নৌকা প্রবেশের সুযোগ নেই। যদি কেউ অনিয়ম করে বা অর্থের বিনিময়ে সুযোগ দেয়, তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যান্য অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
স্থানীয়দের দাবি, সুন্দরবনের জীবিকা নির্ভর ব্যবস্থায় এই ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে বনজীবীদের সংকট আরো গভীর হবে। তারা কঠোর তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সানা/আপ্র/১৭/৪/২০২৬