গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

মেনু

উন্নয়ন থামিয়ে ঋণের বোঝা দ্বিগুণ

সুদের ফাঁদে অর্থনীতি

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৩৪ পিএম, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০০:১৯ এএম ২০২৬
সুদের ফাঁদে অর্থনীতি
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ছবি

উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কমছে, অথচ বিদেশি ঋণের বোঝা দ্রুত ভারী হচ্ছে-এই বৈপরীত্য এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় উদ্বেগের নাম। বাজেট ঘাটতি মেটানো ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে সরকার ক্রমেই উন্নয়নমুখী প্রকল্প ঋণ থেকে সরে গিয়ে দ্রুত ছাড়যোগ্য বাজেট সহায়তা ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন। ফলে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২২ সালের জুনের তুলনায় ৯২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ খুব অল্প সময়েই বিদেশি ঋণের দায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে—যা অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রকল্প ঋণ কমে, বাজেট সহায়তায় ঝোঁক: প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া এবং বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকায় সরকার উন্নয়ন প্রকল্প ঋণের বদলে বাজেট সহায়তা ঋণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রকল্প ঋণে যেখানে দীর্ঘ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থাকে, সেখানে বাজেট সহায়তা ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গেই ছাড় হয় এবং সরাসরি ঘাটতি মেটাতে ব্যবহার করা যায়।

২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ মোট ৯ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা ঋণ পেয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এসেছে ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার—আগের বছরের তুলনায় যা ৬৯ শতাংশ বেশি। বিপরীতে একই সময়ে প্রকল্প ঋণের ছাড় কমেছে ২৯ শতাংশের বেশি।

টাকার অবমূল্যায়নে বাড়ছে ঋণের ভার: ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন বিদেশি ঋণের চাপ আরও বাড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে যেখানে প্রতি ডলার ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ১২২ টাকার কাছাকাছি। কোভিড-পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় ও বৈশ্বিক পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবেই এই অবমূল্যায়ন হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঋণের টাকার অঙ্কে।

সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ঊর্ধ্বমুখী: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) সরকারের মোট ঋণ ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকায়। এতে জিডিপির তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত বেড়ে হয়েছে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে ১১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া, বাকিটা বিদেশি ঋণ।

সুদ পরিশোধেই ব্যয়ের বড় অংশ: ঋণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সুদ পরিশোধের চাপ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকার সুদ বাবদ ব্যয় করেছে ৩১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা—আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ব্যয় বেড়েছে ১৯ শতাংশ, আর বিদেশি ঋণের সুদ ব্যয় বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে ৮০ শতাংশ। বিশেষ করে ট্রেজারি সিকিউরিটিজে সুদ ব্যয় বেড়েছে ২১ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ১৬ শতাংশ।

পরিচালন ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশই সুদে: চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের ৩৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় ৩১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা—খরচ হয়েছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে। একক খাত হিসেবে এটিই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয়। চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে পরিচালন খাতে বরাদ্দ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২২ শতাংশ বা ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধের জন্য—যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণে ১ লাখ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণে ২২ হাজার কোটি টাকা।

উদ্বৃত্ত থাকলেও উন্নয়ন ব্যয় কম: হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের আয় ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকা। ফলে পরিচালন ব্যয় শেষে ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। উন্নয়ন ব্যয় করার পরও সরকারি হিসাবে ৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত রয়েছে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, উন্নয়ন প্রকল্প কম নেওয়া ও চলমান প্রকল্পে ব্যয় কম হওয়ায় এই উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। যদিও রাজস্ব আয় ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, সে অনুপাতে উন্নয়ন ব্যয় হয়নি।

বৈদেশিক ঋণ ৭৪ বিলিয়ন ডলারে: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রাথমিক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে—যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। গত পাঁচ বছরে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। তবে এই হিসাবে আইএমএফের ঋণ ও সরকারের গ্যারান্টি দেওয়া ঋণ অন্তর্ভুক্ত নয়।

ইয়েনের অস্থিরতায় বাড়তি ঝুঁকি: ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাপানি ইয়েনে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ায় মুদ্রা ঝুঁকিও বেড়েছে। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দরপতনের ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের দায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে, যা ভবিষ্যতে পরিশোধ চাপ আরও বাড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মেগা প্রকল্পে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকলেও রিজার্ভ ও পরিশোধ ভারসাম্য রক্ষায় রেকর্ড বাজেট সহায়তা নিতে হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা এলেও দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ বেড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সুদ পরিশোধ ও বেতন-ভাতার মতো অনমনীয় ব্যয় কমানোর সুযোগ না থাকায় বাজেট কাঠামো ঝুঁকিতে পড়ছে। ঋণ নিতে হলে তা এমন খাতে ব্যয় করতে হবে, যেখান থেকে সুদ ও আসলের চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক সুফল আসে।

সামনে কঠিন পথ: বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আদায় জোরদার করা, উচ্চ সুদের ও কঠিন শর্তের ঋণ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত ফলদায়ক প্রকল্পে সীমিত পরিসরে ঋণ নেওয়াই হতে পারে এই চাপ সামাল দেওয়ার পথ। অন্যথায় সুদ পরিশোধই হয়ে উঠবে সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত—যা উন্নয়ন ব্যয়কে আরো সংকুচিত করবে।

সানা/আপ্র/৭/২/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে: তথ্যমন্ত্রী
১৯ মে ২০২৬

দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে: তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে।...

পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকার প্রস্তাব!
১৯ মে ২০২৬

পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকার প্রস্তাব!

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। পরিকল্প...

তিন ধরনের নতুন নোট ছাড়লো বাংলাদেশ ব্যাংক
১৯ মে ২০২৬

তিন ধরনের নতুন নোট ছাড়লো বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্য’ শীর্ষক ১০০০, ৫০০ ও ১০ টাকা মূল্যমানের নতুন ব্যাংক...

গ্রামীণ ব্যাংকের সুদহার কেন স্বাভাবিক ব্যাংকের মতো নয়, প্রশ্ন হাই কোর্টের
১৮ মে ২০২৬

গ্রামীণ ব্যাংকের সুদহার কেন স্বাভাবিক ব্যাংকের মতো নয়, প্রশ্ন হাই কোর্টের

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ সুদহার নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে হাইকোর্টের রুল জারি

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। আপনি কি মনে করেন- গ্রামীণ ব্যাংক সবচেয়ে চড়া সুদ আদায় করে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 14 ঘন্টা আগে