গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৫:০৪ পিএম, ১৯ মে ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৩৪ এএম ২০২৬
করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন
ছবি

ফাইল ছবি

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি করব্যবস্থা। নাগরিকের করেই গড়ে ওঠে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড। কিন্তু কর আরোপের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে শুধু রাজস্ব আহরণের হিসাব নয়, মানুষের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, জীবিকার ধরন এবং ন্যায়সংগত ভারসাম্যের প্রশ্নও বিবেচনায় নিতে হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের সিদ্ধান্ত সেই মানবিক ও বাস্তবসম্মত ভারসাম্য থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে।

আজকের বাংলাদেশে মোটরসাইকেল কেবল শখের বাহন নয়; এটি বহু মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। রাইড শেয়ারিং সেবায় যুক্ত তরুণ-যুবক, অফিসগামী কর্মজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এমনকি উচ্চশিক্ষিত বেকারদের বড় একটি অংশ মোটরসাইকেলনির্ভর আয়ের মাধ্যমে পরিবার চালাচ্ছেন। অনেকে একটি চাকরির আয়ে সংসার সামলাতে না পেরে অতিরিক্ত উপার্জনের জন্য বাইক রাইড করছেন। অর্থাৎ মোটরসাইকেল এখন বাস্তবতার নিরিখে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় ১১১ থেকে ১২৫ সিসি মোটরসাইকেলের জন্য দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির জন্য পাঁচ হাজার টাকা এবং তার বেশি সিসির বাইকের জন্য দশ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপ নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। যদিও প্রতিবাদের মুখে পাঁচ হাজার টাকার কর তিন হাজারে নামিয়ে আনার ঘোষণা এসেছে, তবুও তা স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ, এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এমনিতেই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অনিশ্চিত আয়ের চাপে বিপর্যস্ত।

বর্তমানে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি দেশে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। এই পরিস্থিতিতে বাইকারদের ওপর নতুন করের বোঝা চাপানো কার্যত ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একইভাবে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের জন্য এক হাজার টাকা কর নির্ধারণও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এরা সমাজের সবচেয়ে শ্রমনির্ভর ও আর্থিকভাবে অনিরাপদ জনগোষ্ঠী। কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সীমিত আয়ের ওপর কর চাপানোর আগে রাষ্ট্রকে বহুবার ভাবতে হবে। করনীতি কখনোই এমন হতে পারে না, যা জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত মানুষকে আরো বিপন্ন করে তোলে।

অবশ্য রাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যেক আয়কারী নাগরিককে করের আওতায় আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা ধাপে ধাপে, সহনশীল ও অংশগ্রহণমূলক উপায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, শ্রমজীবী প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের মতামত ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবেই। প্রয়োজনে প্রতীকী হারে কর নির্ধারণ করে ধীরে ধীরে কর-সংস্কৃতির অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে তা এক হাজার টাকার মধ্যে এবং রিকশাচালকদের জন্য প্রথম পর্যায়ে পাঁচশ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-রাষ্ট্র কি সত্যিই কর ন্যায্যতার পথে হাঁটছে? যখন শত শত কোটি টাকা আয়কারী একশ্রেণির মানুষ কর ফাঁকি দেয়, অর্থ পাচার করে কিংবা অবৈধ সম্পদ সঞ্চয় করে, তখন দুর্বল আয়ের মানুষের ওপর নতুন করের চাপ ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাজস্ব আহরণের প্রকৃত সংস্কার শুরু হওয়া উচিত সেইসব প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছ থেকে, যারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বিপুল অর্থ লুকিয়ে রাখে।

মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে নয়, বরং সহনশীলতা, ন্যায়সংগত ভারসাম্য ও সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে রেখেই রাষ্ট্রের করনীতি প্রণয়ন হওয়া উচিত। একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় রাজস্বের অঙ্কে নয়, বরং নাগরিকের কষ্ট বোঝার সক্ষমতায় নিহিত।
সানা/আপ্র/১৯/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে