স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল্পীদের গান পরিবেশনে বাধা এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধার অভিযোগ একই সময়ে সামনে আসা গভীর উদ্বেগের বিষয়। রাজধানীর পুরানা পল্টনে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার অভিযোগও এই উদ্বেগকে আরো বাড়িয়েছে। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও এগুলোর মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে: বাংলাদেশ কি মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বহুত্ববাদ ও নাগরিক অধিকারের পথে এগোচ্ছে, নাকি অসহিষ্ণুতা ও ভীতির সংস্কৃতি আবারো মাথাচাড়া দিচ্ছে?
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মান ও নিজ এলাকায় দাফন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তাঁকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত পুলিশি নিরাপত্তায় গভীর রাতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যাচাইয়ের আইনসম্মত প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু একজন মৃত মানুষের মরদেহকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি, পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলা কিংবা দাফনের অধিকার বাধাগ্রস্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্বীকৃতি রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান পরিবেশনে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ঢাকার ধানমন্ডিতে মানববন্ধন করতে গিয়ে সংস্কৃতিকর্মীরা পুলিশের বাধার মুখে পড়েছেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক করার ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশের বক্তব্য, উসকানিমূলক স্লোগান ও কথাবার্তা নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে তাঁকে হেফাজতে নেওয়া হয়। কিন্তু শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বাধা দেওয়া এবং একজন নাগরিককে আটক করার ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা স্পষ্ট থাকা আবশ্যক। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে ঘিরে বিতর্কের সূত্র ধরে পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার অভিযোগও উঠেছে। দলটির নেতারা হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অভিযোগ করলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও পুলিশ তা নিশ্চিত করেনি। ফলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হবে।
বাউলগান বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। কোনো গানের কথা বা পরিবেশনা নিয়ে আপত্তি থাকলে তার সমাধান হতে পারে যুক্তি, আলোচনা ও প্রচলিত আইনের আশ্রয়ে; ভয়ভীতি, দলবদ্ধ হামলা কিংবা জোর করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে নয়। একইভাবে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো যেমন জরুরি, তেমনি ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যের সাংস্কৃতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগও নেই। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক ও বাক্স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সেই নিশ্চয়তা কার্যকর করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রেরণা ছিল বৈষম্য, নিপীড়ন ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের অবসান ঘটিয়ে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেই অভ্যুত্থানের পর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা দিয়ে আক্রমণ করা, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগানকে কেন্দ্র করে সহিংসতা কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনের অভিযোগ পরিবর্তিত বাংলাদেশের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কোনো স্লোগান বা রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না। অপরাধের অভিযোগের বিচার হবে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে, জনতার রায় কিংবা প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব শুধু নিন্দা জানানো বা তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনসংক্রান্ত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, বাউলশিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ যাচাই এবং পল্টনের হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে রেখে প্রশিক্ষণ, তদারকি এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের দায়িত্ব; অযৌক্তিকভাবে তা বন্ধ করা নয়।
রাষ্ট্রের শক্তি ভিন্নমত দমনে নয়, ভিন্নমতকে নিরাপদে সহাবস্থানের সুযোগ দেওয়ায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ভিত্তি। ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক মত, সাংস্কৃতিক পরিচয় কিংবা অতীতের বিরোধের কারণে কারো মানবিক অধিকার খর্ব হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সরকারকে এখনই দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বৈষম্যহীন বাংলাদেশের যে প্রত্যাশায় গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তা আবারো গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
সানা/আপ্র/২৮/১০/২০২৬