ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের তালিকা। এডিস মশাবাহিত এই রোগ এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সংকট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২৮ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৪০৯ জন। শুধু অক্টোবরের ২৮ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ১৬৪ জনের। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মিলিয়ে প্রাণহানি ৩১২, যা বছরের মোট মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জনে। এই পরিসংখ্যান কেবল রোগের ভয়াবহতা নয়, প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করার জরুরি তাগিদও বহন করে।
অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করতে যথেষ্ট। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এক লাখের বেশি মানুষ। ২০২২ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩৮২, মৃত্যু ২৮১ জনের। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন, প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালেও ডেঙ্গুতে প্রাণহানি ও সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে ছিল। অথচ এত প্রাণহানি ও অভিজ্ঞতার পরও প্রতিবছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে তৎপরতা জোরদারের প্রবণতা দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, আগাম প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক প্রতিরোধব্যবস্থা কেন স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রথম শর্ত এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, জমে থাকা পানি, নালা-নর্দমা ও অপরিচ্ছন্ন জলাধার এ মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তাই শুধু ফগার মেশিনে ধোঁয়া ছড়িয়ে মশা নিধনের আনুষ্ঠানিকতা যথেষ্ট নয়। লার্ভা ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনকে এলাকাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের জন্য জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষার্থীদেরও বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশব্যাপী তিন মাসের পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রচারাভিযানকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে বিদ্যালয়, কলেজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের নিয়মিত সম্পৃক্ত করতে হবে। চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এমন উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন না রেখে দেশব্যাপী ধারাবাহিক করতে হবে।
চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোও সমান জরুরি। ডেঙ্গু রোগীর জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, পরীক্ষার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শিরায় তরল দেওয়ার উপকরণ এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে হবে। রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতির ঝুঁকি বিবেচনায় সতর্কসংকেত শনাক্ত, দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর এবং গুরুতর রোগীর নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। জ্বরকে অবহেলা না করা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজে থেকে ওষুধ না খাওয়ার বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
ডেঙ্গুর টিকা নিয়েও সরকারের সুস্পষ্ট, বিজ্ঞানভিত্তিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দিষ্ট উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য কিউডেঙ্গা টিকা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের জুনে জানিয়েছে, আপাতত গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা হবে না; বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সঙ্গে পরামর্শের কথা বলা হয়েছে। এ অবস্থায় টিকার নিরাপত্তা, কার্যকারিতা, উপযোগী জনগোষ্ঠী, ব্যয় ও সম্ভাব্য সুফল মূল্যায়নে স্বচ্ছ গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ জরুরি। টিকা নিয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় প্রচলিত প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল রাখা চলবে না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, আবার নাগরিকের সচেতনতার ওপর সব দায় চাপিয়েও সরকারের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগও নেই। সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত নজরদারি, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং কঠোর জবাবদিহিই পারে মৃত্যুর মিছিল থামাতে। প্রতিটি প্রাণহানি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। তাই এখন শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক কার্যকর পদক্ষেপ।
সানা/আপ্র/২৯/১০/২০২৬