মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা আবার শুরুর সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। বুধবার দাম বাড়ার পর বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান মানদণ্ডের দাম কমে আসে। তবে অঞ্চলটিতে নতুন করে হামলা ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় দামের পতন সীমিত ছিল।
গ্রিনিচ মান সময় বৃহস্পতিবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ২২ ডলার বা ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১১৪ ডলার ১০ সেন্টে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ দশমিক ৩৩ ডলার বা ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার ৪৫ সেন্টে নেমে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তেলের বাজারে নিম্নমুখী চাপ তৈরি করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বুধবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়িকে চিঠি পাঠিয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
নোমুরা সিকিউরিটিজের অর্থনীতিবিদ ইউকি তাকাশিমা বলেন, শান্তি আলোচনা শুরুর প্রত্যাশায় তেল বিক্রির চাপ বেড়েছে। তবে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা জোরদার হওয়ার আশঙ্কা এবং ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে মার্কিন হামলা হতে পারে—এমন উদ্বেগের কারণে তেলের দাম খুব বেশি কমেনি।
হুতিদের হামলায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং তেল উৎপাদন ও পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাও বাজারকে প্রভাবিত করছে। বৃহস্পতিবার ভোরে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, ইয়েমেনের হুতিদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে আসছিল। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করেছে বলে দাবি করে জোটটি।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দাবি, বুধবার হুতিরা এডেন বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। এর আগের দিন হুতিরা জানিয়েছিল, ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে তারা। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ওই স্থাপনায় হামলার খবর নিশ্চিত করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পর সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল উৎপাদক। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ওই তেল শোধনাগারের দৈনিক পরিশোধন সক্ষমতা ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল।
ইরানের কাছে নতুন শান্তি প্রস্তাব
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের কাছে নতুন একটি খসড়া চুক্তি দিয়েছে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রস্তাবটির বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে এমন কিছু ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয় এবং প্রকৃত কোনো প্রস্তাবের পর্যায়ে পড়ে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বুধবার জানিয়েছেন, তেহরান এখনো কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সফল হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনা গৃহীত হলে তা এক সপ্তাহেরও কম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।
রাশিয়ার তেল উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা
জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৫ অক্টোবর রিয়াজান তেল শোধনাগারে হামলার পর থেকে রাশিয়ার তেল পরিশোধন অবকাঠামোয় নতুন কোনো হামলার খবর নিশ্চিত হয়নি। এর ফলে গত সপ্তাহে দেশটির শোধনাগারগুলোতে তেল পরিশোধনের পরিমাণ দৈনিক ৩ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল বেড়ে ৪০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, তেল পরিশোধন বাড়ার সঙ্গে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল উৎপাদনও কাছাকাছি পরিমাণে বাড়তে পারে। এতে দেশটির উৎপাদন সাম্প্রতিক পতন থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর আগে উৎপাদন কমে দৈনিক ৮৪ লাখ ব্যারেলে নেমেছিল, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন। তবে উৎপাদন বাড়লেও অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি একই হারে বাড়বে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত কমেছে
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন বুধবার জানিয়েছে, ২৩ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ১৯ লাখ ব্যারেল কমেছে। অথচ রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা মজুত ১৫ হাজার ব্যারেল বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের মজুত ৩৯ লাখ ব্যারেল বেড়েছে। বিশ্লেষকেরা যেখানে পেট্রলের মজুত ৯ লাখ ব্যারেল কমার প্রত্যাশা করেছিলেন, সেখানে উল্টো বৃদ্ধি বাজারের হিসাবকে প্রভাবিত করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
এসি/আপ্র/২৯/১০/২০২৬