সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। স্যালাইনের স্ট্যান্ড দিয়ে পিটিয়ে তাঁদের মাথায় আঘাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আহত দুই সাংবাদিকের মাথায় একাধিক সেলাই দিতে হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে রাত প্রায় ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালের ভেতরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। এ ঘটনার প্রতিবাদে মধ্যরাতে সিলেট নগরের চৌহাট্টা পয়েন্টে সমাবেশ করেন সাংবাদিকরা।
আহত সাংবাদিকরা হলেন সিলেট ভিউয়ের প্রতিবেদক নিবেন্দু তালুকদার ও শ্যামল সিলেটের আলোকচিত্র সাংবাদিক রেজা রুবেল।
রোগীর স্বজন ও সাংবাদিকদের মারধরের ঘটনার পর প্রায় দুই ঘণ্টা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এ সময় জরুরি বিভাগের ফটক বন্ধ করে লাঠিসোঁটা হাতে তাঁদের অবস্থান করতে দেখা যায়। এতে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা ভোগান্তিতে পড়েন। কেউ কেউ চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।
অস্ত্রোপচার নিয়ে বিরোধ, পরে সংঘর্ষ
জানা গেছে, দক্ষিণ সুরমার সিলাম এলাকার এক রোগীর অস্ত্রোপচার নিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে তাঁর স্বজনদের বিরোধের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ সময় চিকিৎসকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে রোগীর স্বজনদের মারধর করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ওয়ার্ডের ভেতরে নারীদের ছোটাছুটি শুরু হয়।
ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে সাংবাদিক রেজা রুবেল ও নিবেন্দু তালুকদারকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় স্যালাইনের স্ট্যান্ড দিয়ে আঘাত করে তাঁদের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। দুই সাংবাদিক ছাড়াও রোগীর স্বজন এক নারীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরে জরুরি বিভাগসহ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন চিকিৎসকেরা।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার জেরে দফায় দফায় কর্মবিরতি পালন করে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ
বুধবার রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মুহাম্মদ মঈনুল জাকির জানান, ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এ বিষয়ে জানতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আবু জাফর মো. খালেদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম
সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বুধবার গভীর রাতে নগরের চৌহাট্টা পয়েন্টে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা।
তাঁরা হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, হাসপাতালের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। প্রতিবাদ সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা ঘোষণা দেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিলেটের সব সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বৈঠক করে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করবেন।
বাংলাদেশ মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুহিদ হোসেন বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় সাংবাদিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে আরও কঠোর কর্মসূচি দেবে।
ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনিস রহমান বলেন, সাংবাদিকেরা মানুষের ভোগান্তি ও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরতে সংবাদ সংগ্রহ করেন। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের ওপর হামলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। রোগীর স্বজনদের মারধরের ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, ঘটনার পর হাসপাতালের পরিচালক ও উপপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। সাংবাদিকদের নিরাপদে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিবাদ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ দিদার আলম চৌধুরী নবেল বলেন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা নতুন নয়। এসব ঘটনার অবসান হওয়া প্রয়োজন। সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়বে।
এসি/আপ্র/২৯/১০/২০২৬