যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান এয়ারলাইনসের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সক্রিয় বিমানবালা ক্যারল ফেয়ার ৮৩ বছর বয়সে অবসরে গেছেন। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে যাত্রীসেবায় নিয়োজিত থাকার পর গত ২৬ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের শার্লটগামী একটি উড়োজাহাজে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অবসান ঘটে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, তাঁর শেষ ফ্লাইটটি শার্লট বিমানবন্দরে পৌঁছায় ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত ২টা ৪০ মিনিটে।
ক্যারলের শেষ ফ্লাইট ছিল আমেরিকান এয়ারলাইনসের ৭৩৩ নম্বর ফ্লাইট। স্থানীয় সময় ২৬ অক্টোবর বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে উড়োজাহাজটি শার্লট বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীর্ঘ কর্মজীবনের ইতি টানার এই মুহূর্তটি স্মরণীয় করে রাখতে বিমানবন্দরে বিশেষ আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অবতরণের পর উড়োজাহাজটিকে পানি ছিটিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর ব্যবস্থা ছিল। সাধারণত পাইলটদের শেষ ফ্লাইটে এমন সম্মান জানানো হয়। একজন বিমানবালার ক্ষেত্রে এ আয়োজন ছিল ব্যতিক্রমী স্বীকৃতি।
শেষ যাত্রার জন্য লন্ডন-শার্লট রুটটি ক্যারল নিজেই বেছে নিয়েছিলেন। এর পেছনে রয়েছে তাঁর কর্মজীবনের একটি বিশেষ স্মৃতি। ১৯৮৭ সালের ১৫ জুন পিডমন্ট এয়ারলাইনসের শার্লট-লন্ডন রুটের প্রথম ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই রুট দিয়েই বিদায় নিতে চেয়েছিলেন ক্যারল।
১৯৬৩ সালে শুরু কর্মজীবন: ক্যারলের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬৩ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের জনসন সিটিতে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে চাকরির সন্ধানে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পিডমন্ট এয়ারলাইনসের স্টেশন ব্যবস্থাপকের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে বিমানবালা হিসেবে কাজের সুযোগ পান।
তবে কর্মজীবনের শুরুতে আমেরিকান এয়ারলাইনসে চাকরির আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন ক্যারল। ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ওয়ান মাইল অ্যাট আ টাইম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন তাঁকে বলা হয়েছিল, তিনি আমেরিকান এয়ারলাইনসে কাজ করার উপযুক্ত নন। পরবর্তী সময়ে পিডমন্ট এয়ারলাইনস থেকে ইউএস এয়ারওয়েজ হয়ে তিনি আমেরিকান এয়ারলাইনসে যোগ দেন। বিভিন্ন এয়ারলাইনসের একীভূত হওয়ার ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানেই তাঁর কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটল, যেখানে একসময় কাজের সুযোগ পাননি তিনি।
৩০ হাজার কর্মীর মধ্যে জ্যেষ্ঠতার শীর্ষে: আমেরিকান এয়ারলাইনসে প্রায় ৩০ হাজার বিমানবালা রয়েছেন। তাঁদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছিলেন ক্যারল। তবে তাঁর চেয়েও জ্যেষ্ঠ দুজন কর্মী রয়েছেন, যাঁরা এখন আর নিয়মিত ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করেন না। যদিও তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যাননি, ক্যারলই ছিলেন এয়ারলাইনসটির সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সক্রিয় বিমানবালা।
বিমানবালাদের পেশায় জ্যেষ্ঠতার গুরুত্ব অনেক। এর ওপর নির্ভর করে পছন্দের রুট, কাজের সময়সূচি ও ছুটি বেছে নেওয়ার সুযোগ। দীর্ঘ কর্মজীবনে সেই জ্যেষ্ঠতার সিঁড়ি বেয়ে একেবারে শীর্ষে পৌঁছানোকে নিজের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন ক্যারল।
নিজের সাফল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ৩০ হাজার কর্মীর মধ্যে তিনি এক নম্বরে পৌঁছেছেন। তাঁর কথায়, ‘এর চেয়ে ওপরে ওঠার আর কোনো জায়গা নেই।’ দীর্ঘদিনের পেশাকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, কাজটি তিনি প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেছেন এবং এবার অবসরের সময় এসেছে। অবসরের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ সেনাসদস্যদের বিষয়ক দপ্তরের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবামূলক ও দাতব্য কাজে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
বদলে গেছে নারী বিমানবালাদের কর্মপরিবেশ: ১৯৬৩ সালে ক্যারল যখন পেশায় যোগ দেন, তখন নারী বিমানবালাদের কর্মপরিবেশ ছিল বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। বিভিন্ন এয়ারলাইনসে তাঁদের বিয়ের ওপর বিধিনিষেধ, চেহারা ও শারীরিক গঠন নিয়ে কঠোর শর্ত এবং নির্দিষ্ট বয়সে অবসরে যাওয়ার নিয়ম ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩২ বছর বয়সেই চাকরি ছাড়তে হতো।
এসব বৈষম্যমূলক নিয়মের বিরুদ্ধে নারী বিমানবালাদের দীর্ঘদিন লড়াই করতে হয়েছে। ক্যারল তাঁর আগের প্রজন্মের সেই পথিকৃৎদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, যাঁরা ওজন, বিয়ে ও বয়সসংক্রান্ত বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর কাজ করে যাওয়া সেই পরিবর্তনেরও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তবে দীর্ঘ কর্মজীবনের বিচারে ক্যারলই প্রথম নন। এর আগে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের রন আকানোও ২০১২ সালে ৮৩ বছর বয়সে অবসরে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া বেট ন্যাশ নামের আরেক বিমানবালা ৬৭ বছরের কর্মজীবনের পর ২০২৪ সালে ৮৮ বছর বয়সে মারা যান। তিনি দীর্ঘতম কর্মজীবনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
ক্যারলের অবসর তাই শুধু একজন অভিজ্ঞ কর্মীর বিদায় নয়; এটি বিমান পরিবহনশিল্পে দীর্ঘ কর্মজীবন, পেশাগত নিষ্ঠা ও নারী কর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তিত ইতিহাসেরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়। সূত্র: ইয়াহু ট্রাভেল, পিপল ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৮/১০/২০২৬