গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

মেনু

রাষ্ট্র সংস্কারে দলীয় অবস্থান নয়, প্রাধান্য পাক জাতীয় স্বার্থ

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১০:১৩ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ০৭:১২ এএম ২০২৬
রাষ্ট্র সংস্কারে দলীয় অবস্থান নয়, প্রাধান্য পাক জাতীয় স্বার্থ
ছবি

প্রতীকী ছবি

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছিল। সেই আন্দোলন কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটায়নি; এটি রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ে তোলার একটি বিরল সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত সংস্কার কমিশনসমূহ এবং সেগুলোর আলোকে প্রণীত জুলাই সনদ ছিল সেই আকাঙক্ষার প্রতিফলন। কিন্তু আজ আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, সেই সংস্কার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সংসদীয় বিশেষ কমিটির সাম্প্রতিক সুপারিশে অন্তর্বর্তী আমলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ কার্যত বাতিলের পথে। গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত উদ্যোগগুলো স্থগিত বা বিলম্বিত হওয়ার ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের মূল চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এসব অধ্যাদেশের অনেকগুলোই ছিল জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও মানবাধিকারের ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রয়াস-যেগুলো একটি কার্যকর গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান।

বাংলাদেশের সংবিধান মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্মিত-এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি। সেই মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেই সময়োপযোগী সংস্কার এগিয়ে নেওয়া জরুরি। যদি অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গৃহীত কোনো সংস্কার গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে কিংবা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা বাড়ায়, তবে তা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাতিল করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। একইভাবে বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে যে সংস্কারের রূপরেখা উপস্থাপন করেছে, সেখান থেকেও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যকর প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে।

তবে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অন্তর্বর্তী আমলের বহু উদ্যোগ নিয়ে বিএনপির আপত্তি ছিল। এখন তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে-এটি তাদের গণতান্ত্রিক বৈধতা। কিন্তু এই বৈধতা কোনোভাবেই একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অবাধ অনুমতি নয়; বরং এটি আরো বড় দায়িত্ব-জাতির প্রত্যাশার প্রতি সৎ থাকা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করা।

বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রণয়ন এবং দুর্নীতি দমনের মতো বিষয়গুলোতে আপসের কোনো সুযোগ নেই। এসব ক্ষেত্রে বিলম্ব, সংশয় বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কেবল রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগ ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; আর আইনের শাসন ব্যতীত গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান মেনে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, ফলে তাদের গৃহীত কোনো উদ্যোগ যদি সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তা অবশ্যই সংশোধনযোগ্য। কিন্তু সেই অজুহাতে জনকল্যাণমূলক ও প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোকে বাতিল করা হলে তা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণা হবে।

রাষ্ট্র সংস্কার কোনো দলীয় প্রকল্প নয়; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন সংলাপ, সহনশীলতা এবং দূরদৃষ্টি। সংসদ যদি কেবল বাকবিতণ্ডার মঞ্চে পরিণত হয়, তবে সংস্কারের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

এই মুহূর্তে দেশের মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট- ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব; প্রতিহিংসা নয়, প্রজ্ঞা; এবং সর্বোপরি দলীয় স্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানোই হবে প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা।
সানা/আপ্র/৪/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন
১৯ মে ২০২৬

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি করব্যবস্থা। নাগরিকের করেই গড়ে ওঠে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য...

আগাম বর্ষণ, নিঃস্ব কৃষক ও জলবায়ুর অশনি বাস্তবতা
১৮ মে ২০২৬

আগাম বর্ষণ, নিঃস্ব কৃষক ও জলবায়ুর অশনি বাস্তবতা

ঋতুচক্রের বিপন্ন সংকেত

জনজীবনের চাপ বাড়িয়ে নয়, চাই ন্যায়ভিত্তিক বাজেট
১৭ মে ২০২৬

জনজীবনের চাপ বাড়িয়ে নয়, চাই ন্যায়ভিত্তিক বাজেট

জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়; একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধ...

পদ্মার বুকে উন্নয়নের মহাসংকল্প, দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার এখনই পরীক্ষার সময়
১৬ মে ২০২৬

পদ্মার বুকে উন্নয়নের মহাসংকল্প, দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার এখনই পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বহু দশক ধরে এক নীরব পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভার বহন করে চলেছে। শুষ্ক মৌসুমে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ সুদহার নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে হাইকোর্টের রুল জারি

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। আপনি কি মনে করেন- গ্রামীণ ব্যাংক সবচেয়ে চড়া সুদ আদায় করে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 14 ঘন্টা আগে