গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি ও গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:২৩ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ২০:৫৯ এএম ২০২৬
প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি ও গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ
ছবি

জাতীয় সংসদ ভবন -ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্র কখনো কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, বরং একটি অর্জিত চেতনা-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা একটি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বহুদলীয় অংশগ্রহণ, সহনশীলতা এবং জনগণের সার্বভৌম মতপ্রকাশের অধিকার। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহ, বিশেষ করে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে যে রাজনৈতিক ধারার সূচনা হয়েছিল, তার মূল দর্শন ছিল-রাষ্ট্র পরিচালনায় ভিন্নমতের সহাবস্থান নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, দমন-পীড়ন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এই বিশ্বাস কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার পালাবদলের পর বারবার প্রতিশোধমূলক প্রবণতা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। অতীতের শাসনামলে গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক যেমন ছিল, তেমনি বর্তমান সময়েও যদি সেই একই পথের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা কোনোভাবেই একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে না।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে সাধারণ মানুষ একটি নতুন সূচনার সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছিল। প্রত্যাশা ছিল-রুগ্ন, ক্ষয়ে যাওয়া গণতন্ত্র নতুন প্রাণ ফিরে পাবে; রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়বে; মতপ্রকাশের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার পরপরই যখন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে কার্যত রাজনীতির বাইরে রাখা হয়, তখন প্রশ্ন জাগে-এই পথ কি গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করবে, নাকি তাকে আরো সংকুচিত করবে?

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তার অন্তর্ভুক্তিতে। একটি দলকে নিষিদ্ধ করা মানে কেবল একটি সংগঠনকে থামিয়ে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে কোটি মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, তাদের বিশ্বাস, তাদের মতপ্রকাশের সুযোগ। একটি নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার অংশগ্রহণ না করা কিংবা কৌশলগতভাবে ভোট স্থানান্তরের যে চিত্র দেখা গেছে, তা স্পষ্ট করে-রাজনীতির মাটিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত শক্তির প্রভাব এখনও গভীরভাবে বিদ্যমান। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে গণতন্ত্রের পূর্ণতা অর্জন সম্ভব নয়।

এখানে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তবে তার বিচার অবশ্যই হতে হবে-স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে। কিন্তু সেই দায় পুরো দলের ওপর আরোপ করে তাকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্র যদি বিচার ও প্রতিশোধের সীমারেখা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি অনিবার্যভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরো একটি দিক গভীরভাবে বিবেচ্য। রাজনৈতিক অঙ্গনে সমঝোতা, সহাবস্থান এবং অন্তর্ভুক্তির যে আহ্বান উচ্চারিত হয়, তা বাস্তব নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত না হলে সেই আহ্বান অর্থহীন হয়ে পড়ে। যখন একদিকে বলা হয়-সব দল-মতকে নিয়ে এগোনোর কথা, আর অন্যদিকে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিকে নিষিদ্ধ রাখা হয়, তখন সেই দ্বৈততা গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে। গণতন্ত্র কেবল বক্তব্যে নয়, বরং আচরণে ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করবে। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে এসে ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব-গণতন্ত্রকে সংকীর্ণ ক্ষমতার খেলায় আবদ্ধ না রেখে একটি টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত করা।

অতএব, সময়ের দাবি স্পষ্ট-প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন ন্যায়; অবরোধ নয়, প্রয়োজন অংশগ্রহণ। গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের কণ্ঠকে সমানভাবে মূল্য দেবে এবং আইনের শাসনকে প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়, ন্যায়ের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। অন্যথায় ইতিহাস আবারো প্রমাণ করবে-নিষেধাজ্ঞা কখনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং নতুন সংকটের বীজ বপন করে। 
সানা/আপ্র/১১/৪/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে