গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

মবের পুনরুত্থান: কোথায় রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীলতা?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৮:৫১ পিএম, ০২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২০:৫৯ এএম ২০২৬
মবের পুনরুত্থান: কোথায় রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীলতা?
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ফাইল ছবি

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, শাস্তি দেয় রাষ্ট্র, আর নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব বহন করে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যখন জনতা নিজেরাই অভিযোগকারী, তদন্তকারী, বিচারক ও দণ্ডদাতা হয়ে ওঠে, তখন সেটি কেবল আইনভঙ্গের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মে মাসে ৬৯টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩২ জন নিহত এবং ৭১ জন গুরুতর আহত হওয়ার যে তথ্য উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয়। আরো উদ্বেগজনক হলো, আগের মাসের তুলনায় এ ধরনের সহিংসতায় নিহত ও আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে মব কালচার কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ব্যাধি নয়; এটি ক্রমেই একটি বিপজ্জনক জাতীয় সংকটে রূপ নিচ্ছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মব সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি ঘোষণা করেছিল। সেই ঘোষণা সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই দেশে গুজব, সন্দেহ, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা অভিযোগের জেরে সংঘটিত গণপিটুনির ঘটনা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর অবস্থানের বার্তা এসেছিল বলেই প্রত্যাশা জন্মেছিল যে এই অপসংস্কৃতির অবসান ঘটবে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। প্রশ্ন তাই স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে-রাষ্ট্রের ঘোষিত শূন্য সহনশীলতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে? কেন এখনো মব সহিংসতার ঘটনায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে? কেন অপরাধীরা বারবার একই ধরনের সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার সাহস পাচ্ছে?

মব সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি ন্যায়বিচারের ধারণাকেই ধ্বংস করে দেয়। কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু জনতার ক্ষণিক উত্তেজনা, গুজব কিংবা আবেগ যখন বিচারপ্রক্রিয়ার স্থান দখল করে নেয়, তখন নিরপরাধ মানুষও প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। এতে শুধু একটি জীবন নিভে যায় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, সংবিধানের চেতনা এবং নাগরিক অধিকারের মৌলিক কাঠামো। যে সমাজে জনতার হাতে বিচার সংঘটিত হয়, সেখানে আইনের প্রতি আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আর আইনের প্রতি আস্থা হারানো কোনো সমাজের জন্যই শুভ লক্ষণ নয়।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এখন মবের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এর অর্থ, সহিংস জনতা শুধু ব্যক্তিকে নয়, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক বার্তা আর হতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের বৈধ শক্তি যদি জনতার অবৈধ শক্তির সামনে দুর্বল বলে প্রতীয়মান হয়, তবে অরাজকতা ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে।

একই প্রতিবেদনে ৫৩টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও সমানভাবে উদ্বেগজনক। নদী, সড়ক, রেললাইন কিংবা ফসলি জমি থেকে উদ্ধার হওয়া এসব মরদেহ কেবল সংখ্যা নয়; এগুলো আইন ও বিচারব্যবস্থার সামনে অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রতিটি অজ্ঞাত লাশ একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস, একটি অজানা ঘটনার রহস্য এবং সম্ভাব্য বিচারহীনতার প্রতীক। একইভাবে সীমান্তে হত্যা, নির্যাতন, পুশ ইন, কারা হেফাজতে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা এবং সাংবাদিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রাতিষ্ঠানিক চাপও মানবাধিকার পরিস্থিতির সামগ্রিক দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, যে রাষ্ট্রে মানুষ অপরাধীর চেয়ে মবকে বেশি ভয় পায়, যে সমাজে গুজব আইনের চেয়ে দ্রুত কার্যকর হয়, যে পরিবেশে নাগরিক নিজের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে, সেখানে কল্যাণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তব ভিত্তি পায় না। উন্নয়ন, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা কিংবা গণতান্ত্রিক অগ্রগতি-সবকিছুর পূর্বশর্ত হলো নাগরিক নিরাপত্তা এবং আইনের নিরঙ্কুশ শাসন। নাগরিক যদি মনে করেন যে, যেকোনো সময় কোনো অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে তিনি জনরোষের শিকার হতে পারেন, তাহলে সেই রাষ্ট্রে নিরাপত্তাবোধের সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে।

তাই এখন সময় এসেছে ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান কার্যক্রমের। মব সহিংসতার প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে গুজব প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে বিচার করার একমাত্র বৈধ কর্তৃত্ব তারই হাতে।

মব সহিংসতার পুনরুত্থান নিঃসন্দেহে একটি সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ মবের শক্তি যত বাড়ে, আইনের শাসন তত দুর্বল হয়; আর আইনের শাসন দুর্বল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি সাধারণ নাগরিক। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো-শূন্য সহনশীলতার ঘোষণাকে বাস্তবতার দৃশ্যমান শক্তিতে রূপান্তর করা। রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, মবও নয়।
সানা/আপ্র/২/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে