গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

মেনু

মে দিবসের প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

শ্রমিকের ঘামেই অর্থনীতি, তবু কেন বঞ্চনার অবসান নেই

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৪৭ পিএম, ০১ মে ২০২৬ | আপডেট: ০৩:০৪ এএম ২০২৬
শ্রমিকের ঘামেই অর্থনীতি, তবু কেন বঞ্চনার অবসান নেই
ছবি

শ্রমিকের ঘামেই অর্থনীতি, তবু কেন বঞ্চনার অবসান নেই

পহেলা মে-শ্রমজীবী মানুষের রক্তে লেখা এক অবিনাশী ইতিহাস। শিকাগোর হে মার্কেটের সেই আত্মত্যাগ মানবিক কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের যে অঙ্গীকার বিশ্বমানবতার সামনে স্থাপন করেছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু বাস্তবতা নির্মমভাবে জানিয়ে দেয়-এই অঙ্গীকার এখনো পূর্ণতা পায়নি। বরং বহু ক্ষেত্রে শোষণ ও বৈষম্য নতুন রূপে, আরো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বৈপরীত্য আরো প্রকট। রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস পালিত হয়, উচ্চারণ করা হয় শ্রমিকের অধিকার-কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকের জীবন থেকে বঞ্চনা দূর হয়নি; বরং বহু ক্ষেত্রে তা বেড়েছে। এর একটি মৌলিক কারণ অস্বীকার করার সুযোগ নেই-শাসক ও মালিক শ্রেণির মধ্যে গভীর যোগসূত্র। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারাই অনেক ক্ষেত্রে শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের নিয়ন্ত্রক। ফলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, যেখানে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।

শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয় শ্রমিকের সুরক্ষার জন্য, কিন্তু বাস্তবে সেই আইন লঙ্ঘনের ঘটনাই বেশি দৃশ্যমান। যাদের হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, তারাই অনেক সময় সেই আইন অমান্য করেন। আদালতের পক্ষ থেকেও দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর রায় বিরল। ফলে আইন যেন হয়ে উঠেছে মকড়শার জালের মতো-দুর্বলকে আটকে রাখে, কিন্তু শক্তিশালী সহজেই বেরিয়ে যায়। এই পরিস্থিতি একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি আজও অধিকাংশ শ্রমিকের কাছে অধরা। বাস্তবে তাদের কাজ করতে হয় দীর্ঘসময়, বিনিময়ে মেলে না ন্যায্য পারিশ্রমিক। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এই চিত্র আরো ভয়াবহ-গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনকর্মী কিংবা দিনমজুরদের জীবনে নেই কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম, নেই সামাজিক নিরাপত্তা। তারা জানে-কাজ না করলে খাবার নেই; অধিকার তাদের কাছে বিলাসিতা।

নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের মাত্রা আরো গভীর। একই কাজে কম মজুরি, নিরাপত্তাহীনতা এবং অদৃশ্য শ্রমের অবমূল্যায়ন তাদের প্রতিনিয়ত পিছিয়ে রাখছে। অথচ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে তাদের অবদান অপরিসীম। এই বৈষম্য দূর করা শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক এবং ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় গণমাধ্যম খাতে। যারা সমাজের শোষণ-বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন, সেই সাংবাদিকরাই অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার। ওয়েজবোর্ড থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগে রয়েছে চরম অনিয়ম ও ফাঁকফোকর। বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত। টেলিভিশন, অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মরত হাজার হাজার মানুষের জন্য এখনো কোনো সুসংহত নীতিমালাই গড়ে ওঠেনি। আরো উদ্বেগজনক হলো-কখনো কখনো এই বঞ্চনার পেছনে মালিকপক্ষের সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রভাবশালী সাংবাদিক মহলের ভূমিকা থাকে, যা পেশাটির নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই সামগ্রিক বাস্তবতা আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য উন্মোচন করে; তা হলো-মে দিবস অনেকাংশে প্রতীকী হয়ে পড়েছে। বছরে একদিন শ্রমিকের কথা বলা হয়, কিন্তু বাকি দিনগুলোতে তাদের সংগ্রাম অদৃশ্যই থেকে যায়। এই অবস্থার অবসান জরুরি এবং তা বিলম্বের সুযোগ নেই।

প্রয়োজন সুস্পষ্ট ও কঠোর নীতিগত উদ্যোগ। শ্রম আইন বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর বাস্তবসম্মত হালনাগাদ, নারী শ্রমিকদের সমমজুরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক ও গণমাধ্যম খাতসহ সব শ্রমক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা বিস্তৃত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে জবাবদিহিমূলক ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

মে দিবসের চেতনা কেবল স্মরণে নয়, প্রয়োগে জীবন্ত হতে হবে। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো দয়া নয়-এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কেবল শ্রমিকের প্রতি অবিচার নয়; এটি সমগ্র জাতির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। অতএব এখনই সময়-প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার, নইলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। 
সানা/আপ্র/১/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন
১৯ মে ২০২৬

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি করব্যবস্থা। নাগরিকের করেই গড়ে ওঠে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য...

আগাম বর্ষণ, নিঃস্ব কৃষক ও জলবায়ুর অশনি বাস্তবতা
১৮ মে ২০২৬

আগাম বর্ষণ, নিঃস্ব কৃষক ও জলবায়ুর অশনি বাস্তবতা

ঋতুচক্রের বিপন্ন সংকেত

জনজীবনের চাপ বাড়িয়ে নয়, চাই ন্যায়ভিত্তিক বাজেট
১৭ মে ২০২৬

জনজীবনের চাপ বাড়িয়ে নয়, চাই ন্যায়ভিত্তিক বাজেট

জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়; একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধ...

পদ্মার বুকে উন্নয়নের মহাসংকল্প, দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার এখনই পরীক্ষার সময়
১৬ মে ২০২৬

পদ্মার বুকে উন্নয়নের মহাসংকল্প, দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার এখনই পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বহু দশক ধরে এক নীরব পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভার বহন করে চলেছে। শুষ্ক মৌসুমে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ সুদহার নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে হাইকোর্টের রুল জারি

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। আপনি কি মনে করেন- গ্রামীণ ব্যাংক সবচেয়ে চড়া সুদ আদায় করে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 14 ঘন্টা আগে