গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

মেনু

স্বাধীন নীতি থেকে শর্তাধীন অর্থনীতি

বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন জরুরি

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:১২ পিএম, ০৭ মে ২০২৬ | আপডেট: ২২:৪৩ এএম ২০২৬
বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন জরুরি
ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো কূটনৈতিক অনুগ্রহের ফসল নয়; এটি এক সশস্ত্র গণসংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত ইতিহাস, যেখানে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ জাতির চেতনায় স্থায়ী দিশারী হয়ে আছে। সেই স্বাধীনতার মৌলিক ভিত্তি-নিজস্ব নীতিনির্ধারণের অধিকার, অর্থনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। কিন্তু সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তি এই ভিত্তিগুলোকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

চুক্তির বিষয়বস্তু ও শর্তাবলির বিশ্লেষণ বলছে, এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সমঝোতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের পরিসরে বহিরাগত প্রভাবের সম্ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঝুঁকি বহন করছে। এমন শর্তের কথা উঠে এসেছে, যেখানে তৃতীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক, বাণিজ্য কিংবা কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এটি নিছক বাণিজ্যিক ইস্যু নয়-এটি রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক প্রশ্ন।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট এখানে অনিবার্যভাবে ফিরে আসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক শক্তির অবস্থান ছিল সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত। যে শক্তি তখন এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে সহমর্মী ছিল না, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর সেই শক্তির সঙ্গে এমন একটি চুক্তি-যেখানে শর্তের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে-তা নিছক কাকতালীয় বলে এড়িয়ে যাওয়া কি সম্ভব? প্রতিশোধের ভাষা কূটনীতিতে উচ্চারিত না হলেও, প্রভাব বিস্তারের কৌশল যে বহুস্তরীয় ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, তা ইতিহাসই শিক্ষা দেয়। ফলে এই চুক্তি কি কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের অংশ, নাকি বাস্তবতার নিরিখে একটি প্রয়োজনীয় সমঝোতা-এই প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর খোঁজা জরুরি।

আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া ও প্রেক্ষাপট। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাববাহী চুক্তি স্বাক্ষর-নীতিগতভাবে কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারের নীতিগত অবস্থান, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাত্রা নিয়ে যে অভিযোগ ও সমালোচনা রয়েছে, তা এই চুক্তিকে ঘিরে জনমনে সন্দেহের আবহ তৈরি করেছে। যদিও কোনো অভিযোগ প্রমাণিত সত্য নয়, তবু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে সন্দেহই হয়ে ওঠে প্রধান বাস্তবতা।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও চুক্তিটি গভীর বিশ্লেষণ দাবি করে। শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন, নির্দিষ্ট দেশ থেকে পণ্য ও জ্বালানি আমদানির প্রবণতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত ও তথ্যগত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন-সব মিলিয়ে এটি অর্থনীতিকে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকিয়ে দিতে পারে। বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব যেখানে উন্নয়নের পূর্বশর্ত, সেখানে একক নির্ভরতার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্প, কৃষি ও ওষুধখাতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এই চুক্তির আরেকটি মাত্রা উন্মোচন করেছে। জাতীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত টেকসই হতে পারে না। রাষ্ট্রকে এখানে কেবল অর্থনৈতিক যুক্তি নয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় এমন চুক্তি অপরিহার্য এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কিন্তু তুলনার ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়-চুক্তিটি কি সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে, নাকি একপাক্ষিক শর্তে ভারসাম্যহীন? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো-গভীর, স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা। জাতীয় সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং জনমতের প্রতিফলন ছাড়া এমন একটি চুক্তিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক হতে পারে না। প্রয়োজনে সংশোধন, পুনর্বিবেচনা কিংবা বাতিল-সবকিছুই আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল অতীতের গৌরব নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণের ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে অক্ষুণ্ন রাখার দায় রাষ্ট্রের। কোনো চুক্তি যদি সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে, তবে সেটিকে পুনরায় বিচার করাই হবে প্রকৃত স্বাধীনতার প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয়।
সানা/আপ্র/৭/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন
১৯ মে ২০২৬

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি করব্যবস্থা। নাগরিকের করেই গড়ে ওঠে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য...

আগাম বর্ষণ, নিঃস্ব কৃষক ও জলবায়ুর অশনি বাস্তবতা
১৮ মে ২০২৬

আগাম বর্ষণ, নিঃস্ব কৃষক ও জলবায়ুর অশনি বাস্তবতা

ঋতুচক্রের বিপন্ন সংকেত

জনজীবনের চাপ বাড়িয়ে নয়, চাই ন্যায়ভিত্তিক বাজেট
১৭ মে ২০২৬

জনজীবনের চাপ বাড়িয়ে নয়, চাই ন্যায়ভিত্তিক বাজেট

জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়; একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধ...

পদ্মার বুকে উন্নয়নের মহাসংকল্প, দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার এখনই পরীক্ষার সময়
১৬ মে ২০২৬

পদ্মার বুকে উন্নয়নের মহাসংকল্প, দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার এখনই পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বহু দশক ধরে এক নীরব পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভার বহন করে চলেছে। শুষ্ক মৌসুমে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ সুদহার নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে হাইকোর্টের রুল জারি

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। আপনি কি মনে করেন- গ্রামীণ ব্যাংক সবচেয়ে চড়া সুদ আদায় করে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 13 ঘন্টা আগে