গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

পেহেলি ভৈরবীর শেষ গানের সুর থামলো ভোরের রক্তাক্ত সড়কে

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০২:৩৩ পিএম, ০৮ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৬:১২ এএম ২০২৬
পেহেলি ভৈরবীর শেষ গানের সুর থামলো ভোরের রক্তাক্ত সড়কে
ছবি

উদীয়মান বাউল শিল্পী পেহেলি ভৈরবী -ছবি সংগৃহীত

বৈরাগী বাজারের মাজার প্রাঙ্গণে তখন গভীর রাত। বাতাসে ধূপের গন্ধ, দোয়ার মৃদু সুর আর মানুষের ভিড়ের মধ্যে ভেসে আসছিল এক তরুণীর কণ্ঠ। সেই কণ্ঠে ছিল বাউলগানের টান, লোকসুরের মায়া, আর জীবনের প্রতি অদম্য ভালোবাসা। মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন শত শত মানুষ। কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিলেন, কেউ সরাসরি সম্প্রচার দিচ্ছিলেন, কেউবা চোখ বুজে শুনছিলেন গানের সুর।

সেই তরুণী পেহেলি ভৈরবী। বয়স মাত্র ২০। তাঁর গানের আসর শেষ হয়েছিল রাতের শেষ প্রহরে। কিন্তু কেউ জানত না, সেটিই হয়ে থাকবে তাঁর জীবনের শেষ মঞ্চ, শেষ গান, শেষ করতালি।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোরে বাবার সঙ্গে বাসে করে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের বাড়িতে ফিরছিলেন তিনি। বাড়ি ফেরা আর হলো না। সিলেটের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নয়জনের সঙ্গে ঝরে গেল তাঁর তরুণ প্রাণও।

যে রাত ছিল উৎসবের
বিশ্বনাথ উপজেলার হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজারে প্রতি মাসে দোয়া মাহফিল শেষে গানের আয়োজন হয়। দূর-দূরান্ত থেকে শিল্পীরা আসেন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পেহেলি ভৈরবী বাবুল মিয়ার সঙ্গে সেখানে পৌঁছান। এর আগেও তিনি একাধিকবার এই মাজারে গান গেয়েছেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত আবুল হোসেন বলেন, “আমি নিজে তাঁর গান শুনেছি। কয়েকটি ভিডিওও করেছি। কী প্রাণ দিয়ে গান গাইছিল মেয়েটা! সকালে যখন শুনলাম সে আর নেই, বিশ্বাস করতে পারিনি।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আনিছ আহমদও জানান, গভীর রাত পর্যন্ত মাজার এলাকা গানের সুরে মুখর ছিল।

সেই রাতেই ফেসবুকে পেহেলি লিখেছিলেন—“আজ বিশ্বনাথ, রামপাশা, বৈরাগী বাজারে হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজারের প্রোগ্রামে যাব। আশপাশে যারা আছেন, সবাইকে দাওয়াত রইল।”

এ যেন জীবনের শেষ আমন্ত্রণ ছিল।

পেহেলি, যার আসল নাম ইসরাত
স্বজনেরা জানান, পেহেলি ভৈরবীর প্রকৃত নাম **ইসরাত জাহান**। কিন্তু মঞ্চ, ভক্ত-শ্রোতা আর সহশিল্পীদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু পেহেলি ভৈরবী।

ভৈরব পৌর শহরের চণ্ডীবের উত্তরপাড়ার সেই মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই গান ভালোবাসতেন। মা রোজিনা বেগম নিজেও সংগীতশিল্পী। তিনিই মেয়ের প্রথম গানের শিক্ষক।

 

কান্নাভেজা কণ্ঠে মা বলেন, “রাত একটার দিকে মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। বুঝতেই পারিনি, এটাই শেষ কথা।”

একজন মায়ের এই আক্ষেপের ভেতরে যেন থমকে আছে সমগ্র পৃথিবীর সব শোক।

মায়ের কোল থেকে মঞ্চে
পেহেলি ছোটবেলা থেকেই মায়ের পাশে বসে গান শিখতেন। উঠোনে, পারিবারিক অনুষ্ঠানে, পাড়ার আসরে—ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি নিয়মিত বাউল ও লোকগান পরিবেশন করছিলেন।

অল্প সময়েই সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেলে তাঁর গান প্রকাশিত হয়। কয়েকটি গানের দর্শকসংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। একটি ১০ গানের অ্যালবামও প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর।

পরিবার জানায়, গত এক বছরে গান গেয়ে তিনি ভালো সম্মানী পেতে শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন সংগঠন থেকে পেয়েছিলেন সম্মাননাও। সংসারের স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে রঙ পেতে শুরু করেছিল।

বাবার সঙ্গে শেষ সফর
পেহেলি কখনো একা অনুষ্ঠানে যেতেন না। কখনো মা, কখনো বাবা সঙ্গে থাকতেন। এবার সঙ্গী ছিলেন বাবা বাবুল মিয়া। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

যে বাবা মেয়েকে নিয়ে গানের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, সেই বাবাই এখন হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন—এ এক নির্মম নিয়তির উপাখ্যান।

ভৈরবে শোকের মাতম
শুক্রবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে যখন পেহেলির মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়ির সামনে এসে থামে, মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো এলাকা।

মা রোজিনা বেগম মেয়ের পায়ের কাছে বসে বারবার বলছিলেন, “এত তাড়াতাড়ি কেমনে চইল্লা গেলি? আমি কারে নিয়া থাকুম? কে আমারে গান শোনাইবো?”

প্রতিবেশীরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ চোখ মুছছিলেন, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন। একজন বললেন, “মেয়েটা বেঁচে থাকলে আরও অনেক মানুষকে গান শোনাতে পারত।”

সহশিল্পীদের কণ্ঠে শোক
পেহেলির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় শোকবার্তায়।

শিল্পী মুন লেখেন, “জীবন সত্যিই কতটা অনিশ্চিত। গত রাতে গান গেয়ে আজ সকালে বাড়ি ফেরার পথেই সে চলে গেল।”

শিল্পী এস কে সুমন লিখেছেন, “ঘুম থেকে উঠে খবরটা শুনে চমকে গেছি। পেহেলি আর আমাদের মাঝে নেই।”

সহশিল্পী উবায়দুল কাওয়াল বলেন, “ওর গানের ধারা ছিল আলাদা। ওর জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখে ভালো লাগত। এত অল্প বয়সে একজন বাউলশিল্পীর চলে যাওয়া মানে মনের গান গাওয়ার একজন মানুষ কমে যাওয়া।”

যে সড়ক কেড়ে নিল নয়টি জীবন
ওসমানীনগরের এই দুর্ঘটনায় মোট নয়জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরা কিশোরগঞ্জের সাইফুল ইসলাম, তিন বছরের শিশু ফাইজা, পরিবারের একমাত্র অবলম্বন সপ্তম রায় প্রীতমসহ আরও অনেকে।

শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

শেষ করতালির পর
কোনো কোনো শিল্পীর জীবন খুব দীর্ঘ হয় না, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া সুর দীর্ঘদিন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। পেহেলি ভৈরবীর জীবনও হয়তো তেমনই এক অসমাপ্ত গান।

রাতের মঞ্চে তিনি মানুষকে আনন্দ দিয়েছিলেন। কেউ তখন ভাবেনি, কয়েক ঘণ্টা পর সেই কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে। মাজার প্রাঙ্গণে যে সুরে মানুষ মুগ্ধ হয়েছিল, ভোরের রক্তাক্ত মহাসড়ক সেই সুর কেড়ে নিয়েছে নির্মমভাবে।

তবু হয়তো বৈরাগী বাজারের সেই রাতের বাতাসে এখনও ভেসে বেড়ায় তাঁর কণ্ঠের শেষ সুর—এক তরুণ বাউলশিল্পীর অপূর্ণ স্বপ্ন, অসমাপ্ত গান আর অশ্রুভেজা বিদায়ের অনন্ত প্রতিধ্বনি। 
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ট্রেনে গান গাওয়া সেই ছেলে আজ তারকা
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ট্রেনে গান গাওয়া সেই ছেলে আজ তারকা

বর্তমান সময়ের হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় ও গুণী তারকাদের একজন আয়ুষ্মান খুরানা। বলিউডে এক যুগেরও বেশি সময়...

হামলার পর দেশে ফিরে যা বললেন বাঁধন
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হামলার পর দেশে ফিরে যা বললেন বাঁধন

ইতালির ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব থেকে দেশে ফিরেছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল...

নীরবেই পার ফরিদা পারভীনের প্রথম প্রয়াণবার্ষিকী
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নীরবেই পার ফরিদা পারভীনের প্রথম প্রয়াণবার্ষিকী

অচিন পাখি সংগীত একাডেমিতে স্মরণ অনুষ্ঠান ২৬ সেপ্টেম্বর

মা হতে চলছেন মাহিরা খান
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মা হতে চলছেন মাহিরা খান

আবারো মাতৃত্বের পথে পাকিস্তানি অভিনেত্রী মাহিরা খান। ৪১ বছর বয়সে দ্বিতীয় সন্তানের অপেক্ষায় রয়েছেন তি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই