বর্ষা মানেই শুধু সর্দি-কাশি বা সংক্রমণের ঝুঁকি নয়, বাড়িতে রাখা ওষুধও এই সময়ে সহজেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ভ্যাপসা গরম এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, এমনকি ইনসুলিনের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে। তাই এই মৌসুমে ওষুধ সংরক্ষণে বাড়তি সতর্কতা জরুরি বলে পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
বর্ষাকালে অনেকেই লক্ষ্য করেন, ট্যাবলেট নরম বা চটচটে হয়ে যাচ্ছে, ক্যাপসুলের গঠনও বদলে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এর প্রধান কারণ বাতাসের অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প। ওষুধের স্ট্রিপ থেকে একটি ট্যাবলেট বের করার সময় যদি প্যাকেটের অন্য অংশে ফাঁক তৈরি হয়, তবে সেই পথ দিয়ে আর্দ্রতা ঢুকে বাকি ওষুধও নষ্ট হতে পারে।
চিকিৎসদের মতে, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল আর্দ্রতা শোষণ করলে দ্রুত কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে। তখন সেগুলো নরম, চটচটে বা বিকৃত হয়ে যেতে পারে। কিছু ওষুধ আবার তাপ-সংবেদনশীল হওয়ায় সামান্য বেশি গরমেও নষ্ট হয়ে যায়। ইনসুলিন, ভ্যাকসিন, কিছু সিরাপ ও নির্দিষ্ট ধরনের ট্যাবলেট এই তালিকায় রয়েছে। তাই এসব ওষুধ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্যাকেটে দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব ওষুধ ফ্রিজে রাখার কথা উল্লেখ থাকে, সেগুলো অবশ্যই নির্ধারিত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, জানালার ধারে বা এমন জায়গায় ওষুধ রাখা উচিত নয়, যেখানে সরাসরি রোদ বা বৃষ্টির ছিটেফোটা লাগতে পারে। এমনকি জানালা বন্ধ থাকলেও সেখান দিয়ে তাপ প্রবেশ করতে পারে, যা ওষুধের গুণাগুণ নষ্ট করতে পারে।
কেন বর্ষায় ওষুধের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন: বর্ষাকালে বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকে। এই আর্দ্রতা ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, গুঁড়া ও কিছু তরল ওষুধের গুণগত মানে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ওষুধ দেখতে স্বাভাবিক থাকলেও আগের মতো কার্যকর নাও থাকতে পারে।
কীভাবে ওষুধ সংরক্ষণ করবেন: ওষুধ সবসময় শুষ্ক, ঠান্ডা এবং সরাসরি রোদ পড়ে না-এমন জায়গায় রাখুন। ইস্ত্রি, হেয়ার ড্রায়ার, হেয়ার স্ট্রেইটনার বা তাপ উৎপন্ন করে এমন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের পাশে ওষুধ রাখবেন না। ওষুধের স্ট্রিপ থেকে ট্যাবলেট বের করার সময় এমনভাবে কাটুন- যাতে অন্য অংশ দিয়ে বাতাস বা আর্দ্রতা ঢুকতে না পারে। ফাঁক তৈরি হলে সেটি ভালোভাবে মুড়ে রাখুন। নিয়মিত সঙ্গে ওষুধ বহন করলে কাগজের খামের বদলে বায়ুনিরোধী পাত্র বা কৌটা ব্যবহার করুন। ব্যাগে রাখা ওষুধ বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেলে বা অতিরিক্ত গরমে থাকলে তা ব্যবহার না করে আগে ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।
কোথায় ওষুধ রাখা সবচেয়ে ভালোধ: ওষুধ রাখার জন্য ভালো জায়গা হতে পারে শোবার ঘরের আলমারি, ড্রয়ার বা ঠান্ডা ও শুকনো স্টোরেজ ক্যাবিনেট। তবে প্রতিটি ওষুধের গায়ে বা লিফলেটে দেওয়া সংরক্ষণের নির্দেশনা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। কিছু ওষুধ সাধারণ তাপমাত্রায় রাখতে হয়, আবার কিছু ওষুধ ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ফ্রিজে রাখতে হয়।
ওষুধ শিশুদের নাগালের বাইরে রাখা: ওষুধ সব সময় শিশুদের হাতের নাগালের বাইরে এবং সম্ভব হলে তালাবদ্ধ আলমারিতে রাখুন। এতে দুর্ঘটনাবশত ওষুধ খেয়ে ফেলার ঝুঁকি কমে। ওষুধ ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা চিকিৎসারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষাকালের অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই ওষুধ সব সময় ঠান্ডা, শুষ্ক ও নিরাপদ স্থানে রাখুন, মূল প্যাকেট ব্যবহার করুন এবং প্রতিটি ওষুধের সংরক্ষণবিষয়ক নির্দেশনা মেনে চলুন। এতে প্রয়োজনের সময় ওষুধ থেকে সর্বোচ্চ উপকার পাওয়া সম্ভব হবে।
ইনসুলিন সংরক্ষণে সতর্কতা: ডায়াবেটিসের চিকিৎসক প্রণব ঘোড়ির মতে, ইনসুলিন কোথায় এবং কীভাবে রাখতে হবে, তা সাধারণত প্যাকেটের গায়েই উল্লেখ থাকে। বেশির ভাগ ইনসুলিন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা গেলেও সরাসরি রোদ, অতিরিক্ত গরম বা বৃষ্টির পানির সংস্পর্শে এলে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিছু ধরনের ইনসুলিন আবার অবশ্যই ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়। তাই ব্যবহারের আগে প্যাকেটের নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
কেএমএএ/আপ্র/২৯.০৭.২০২৬