যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে বিদেশি কর্মীদের অপেক্ষার সময় দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা আবেদন করার সুযোগ থাকলেও নতুন নিয়মে অধিকাংশ বিদেশি কর্মীকে অপেক্ষা করতে হবে ১০ বছর। তবে নির্দিষ্ট আয়ের সীমা পূরণ করলে পাঁচ কিংবা তিন বছরেই আবেদনের সুযোগ থাকবে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ গত সোমবার (২ নভেম্বর) পার্লামেন্টে এসব পরিবর্তনের কথা জানান। আগামী বছর থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, যারা বর্তমানে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদেরও নতুন নিয়ম মেনে চলতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যাঁদের বার্ষিক আয় ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি, তাঁরা পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আর যাঁদের আয় ১ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি, তাঁরা তিন বছর পরই আবেদনের সুযোগ পাবেন।
কেয়ার কর্মীদের জন্য বিশেষ ছাড়
নতুন অভিবাসন নীতিতে কেয়ার কর্মীদের জন্য বিশেষ ছাড় রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে পারলে তাঁরাও পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের বার্ষিক আয় কমপক্ষে ২৫ হাজার পাউন্ড হতে হবে। পাশাপাশি ভিসার সব শর্তও পূরণ করতে হবে।
করোনা মহামারির পর যুক্তরাজ্যের কেয়ার খাতে কর্মীর সংকট দেখা দেয়। সে সময় বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী দেশটিতে আসেন। তাঁদের বড় একটি অংশ এখনো এই খাতে কাজ করছেন।
নতুন নিয়মের প্রাথমিক প্রস্তাবে কেয়ার কর্মীদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। তবে লেবার পার্টির ভেতরে বিরোধিতা এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সমালোচনার মুখে সরকার তাঁদের জন্য ছাড় দিয়েছে।
শাবানা মাহমুদ বলেন, যাঁরা কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং দেশের প্রয়োজনের সময় এগিয়ে এসেছেন, তাঁদের জন্য স্থায়ী হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
শরণার্থীদের অপেক্ষা সর্বোচ্চ ৩০ বছর
শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম কঠোর করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকারের নির্ধারিত নিরাপদ ও বৈধ পথে আসা শরণার্থীরা পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন। অন্য শরণার্থীদের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় হবে ২০ বছর। তবে তাঁরা কাজ বা পড়াশোনা করলে এই সময় কমে ১০ বছর হতে পারে।
আর ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসার মতো অনিয়মিত পথে প্রবেশকারীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে সর্বোচ্চ ৩০ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
স্থায়ী বসবাসে আরো যেসব শর্ত
যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পেলে একজন ব্যক্তি দেশটিতে কাজ ও পড়াশোনা এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের সুযোগ পান। পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে সরকারি আর্থিক সুবিধাও পাওয়া যায়।
নতুন নিয়মে স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের আরও কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে। ইংরেজিতে উচ্চ মানের দক্ষতা থাকতে হবে। সরকারের কাছে কোনো বকেয়া অর্থ থাকলেও আবেদন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া অন্তত তিন বছর জাতীয় বিমা চাঁদা দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে।
সাশ্রয় হবে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড
যুক্তরাজ্য সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন নিয়মের কারণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ আগের তুলনায় দেরিতে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাবেন। এতে সরকারি বিভিন্ন সুবিধা খাতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হবে।
সরকারের ধারণা, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাবেন। ১২ সপ্তাহের জনমত যাচাই প্রক্রিয়ায় দুই লাখের বেশি মতামত জমা পড়ার পর এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যে অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অভিবাসন নীতি কঠোর করার চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে শরণার্থীদের প্রবেশ রাজনৈতিক বিতর্কের বড় বিষয় হয়ে ওঠে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ির দাবিতে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে পার্টিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
সরকারের দাবি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা বাড়ায় চলতি বছরে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ঘটনা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসি/আপ্র/০৩/১১/২০২৬