ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি গুরুতর মন্দার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাও ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা।
‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে, যা কার্যত মন্দার কাছাকাছি পরিস্থিতি নির্দেশ করে। ১৯৮০ সালের পর এমন পরিস্থিতি মাত্র কয়েকবার দেখা গেছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ ছিল কোভিড মহামারির সময়।
ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৭ সালে ১২৫ ডলারে পৌঁছালে প্রবৃদ্ধি আরও ধীর হয়ে পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়াতে হতে পারে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ের গোরিনচা বলেছেন, ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অনেক দেশের মানুষের কাছে কার্যত মন্দার মতোই অনুভূত হবে। এতে বেকারত্ব বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তীব্র হতে পারে।
তবে সংঘাত দ্রুত নিরসন হলে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি স্বাভাবিক হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে, যদিও তা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কম।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চলতি বছরে দেশটির প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ০ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোতেও প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে, যদিও যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে ২০২৭ সালে তা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে কাতার ও ইরাকের অর্থনীতিতেও সাময়িক সংকোচনের পর পুনরুদ্ধারের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। সংস্থাটির মতে, গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণ সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি ‘মহাবিপর্যয়’-এ রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে মজুদ থাকায় খাদ্যপণ্যের দাম তেমন বাড়েনি। তবে জ্বালানি ও সারের সংকট অব্যাহত থাকলে বছরের শেষ ভাগ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্বে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের বড় অংশ এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে রপ্তানি হয়। ফলে এ পথের অচলাবস্থা বৈশ্বিক কৃষিকে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ইতোমধ্যে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন দেশে সার উৎপাদন কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কৃষকরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন, যা উৎপাদন হ্রাস এবং খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াবে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত শুরু হয়। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয়।
পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সানা/আপ্র/১৫/৪/২০২৬