বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মোটরসাইকেলটি তাহসিফের বলে ধারণা করছে তদন্ত সংস্থা। এদিকে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালিয়েছেন তদন্তকারীরা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, তুরাগ নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মাজার বস্তি এলাকায় মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে। এতে কোনও নম্বর প্লেট ছিল না। তাহসিফ বাসা থেকে যে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন, সেটিও নম্বর প্লেটবিহীন ছিল বলে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। এ কারণে উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি তাঁর বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মালিকানা নিশ্চিত হতে যাচাই-বাছাই চলছে।
অন্যদিকে পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল শুক্রবার সকালে বলেন, “আমরা তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছি।” তবে মোটরসাইকেলটির মালিকানা ও ঘটনার সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
পিবিআইয়ের এক পুলিশ সুপার জানান, দীপের দেখানো স্থান থেকেই নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মোটরসাইকেলটি পাওয়া যাওয়ার স্থানের দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে। স্থানটি উত্তরখান থানার অধীন। আর মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থান টঙ্গী পশ্চিম থানার আওতাভুক্ত। তবে দুটি স্থানের সঙ্গেই তুরাগ নদের সংযোগ রয়েছে।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় নৌ পুলিশ মামলা তদন্ত করছে। ঘটনাটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পিবিআই ছায়া তদন্ত করছে এবং নৌ পুলিশকে সহযোগিতা করছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবু ইউসুফ।
দীপের বক্তব্য, ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন তাহসিফ
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে তাঁর সঙ্গে থাকা দীপকে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। পরে তাঁকে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়।
পিবিআইয়ের এক পুলিশ সুপার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বলেছেন, “আমরা সেখানে (ঘটনাস্থল) কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেয়। আর আমি পালিয়ে আসি।”
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীপের দেওয়া এ বক্তব্যসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেসব তথ্য এখনই প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফের বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফের মৃত্যুর আগের রাতে দীপ তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এ কারণে তাঁর কাছ থেকে ওই রাতের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হবে।
ছয় ঘণ্টা একসঙ্গে ছিলেন তাহসিফ ও দীপ
পারিবারিক সূত্র ও সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ির বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ। বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই দীপের ফোন পেয়ে তিনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম।
উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাঁদের দেখা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দুজনকে হাত মেলানোর পর আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে করে চলে যেতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ফুটেজে থাকা ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা দেখা দেওয়ায় তাঁরা সেটি মেরামতের জন্য একটি গ্যারেজে যান। পরে উত্তরার রুয়াপ শপিং কমপ্লেক্সের ‘কুকরুকু’ রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খান। সেখান থেকে বের হয়ে দুজন নিজ নিজ মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন। উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকা পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন। রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আলাদা হয়ে যান। এরপর দীপ নিজের বাসায় ফিরে গেলেও তাহসিফের বিষয়ে আর কিছু জানেন না বলে দাবি করেছিলেন।
দীপ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
মায়ের ফোনে ফিরতে চাওয়ার বার্তা, তারপর নিখোঁজ
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের ফোন পাওয়ার পরই বাসা থেকে বের হন তাঁর ছেলে। রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মুঠোফোনে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। তবে বার্তাটিতে তাঁকে কিছুটা ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে জানান বাবা।
এরপর থেকে তাঁর আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাহসিফের মায়ের মুঠোফোনে পাঠানো সর্বশেষ কণ্ঠবার্তাটি নিয়েও তাঁদের সন্দেহ রয়েছে। এক নিকটাত্মীয়ের বক্তব্য, ওই কণ্ঠবার্তাটি তাহসিফের বলে তাঁর মনে হয়নি।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা মুঠোফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফ সাউরীর বলে শনাক্ত করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পরদিন বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন না। তিনি হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এটি আত্মহত্যা নয়; যথাযথ তদন্ত হলে অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, নদীতে তাঁর পড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি, দীপের বক্তব্যের সত্যতা এবং উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটির সঙ্গে ঘটনার সংশ্লিষ্টতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে নৌ পুলিশ ও পিবিআই।
সানা/আপ্র/৩০/১০/২০২৬