গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:২৯ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৪:৩০ এএম ২০২৬
তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক
ছবি

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরীর ফাইল ছবি

একজন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরীর (২৮) তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহ এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যবহৃত বলে ধারণা করা নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনা মৃত্যুর রহস্যকে আরো ঘনীভূত করেছে। ঘটনার প্রতিটি নতুন তথ্যের সঙ্গে সামনে আসছে একাধিক প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রমাণভিত্তিক উত্তর খুঁজে বের করা এখন তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব।

গত ২৭ অক্টোবর উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরদিন বিকেলে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের সঙ্গে থাকা মুঠোফোন ও হাতঘড়ির সূত্রে পরিচয় শনাক্ত হয়। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা দেওয়া হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হয়নি। তাঁর শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকাও মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি হতে পারে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের সমন্বিত বিশ্লেষণ ছাড়া মৃত্যুকে দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা কিংবা হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা দায়িত্বশীল হবে না।

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন তাঁর বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, দীপের ফোন পেয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। দুজনকে একসঙ্গে চলাফেরা করতে দেখা গেছে সিসিটিভি ফুটেজেও। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের খাবার শেষে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাঁরা আলাদা হয়ে যান। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেছেন, কিছু লোকের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং তিনি পালিয়ে আসেন। তাঁর এই বক্তব্য সত্য হলে ধাওয়াকারীরা কারা, কেন তাঁরা দুজনকে ধাওয়া করেছিল এবং তাহসিফের বিপদের মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা উদ্ঘাটন অপরিহার্য।

মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এটি তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল। দীপের দেখানো স্থান থেকে সেটি উদ্ধারের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। মোটরসাইকেলটি কীভাবে সেখানে পৌঁছাল, কে বা কারা সেটি সরিয়েছে এবং এর সঙ্গে মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নিশ্চিত করতে হবে।

তাহসিফ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণ করেছিলেন বলে সামাজিক পরিসরে আলোচনা রয়েছে। তবে এ তথ্যের সত্যতা কিংবা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত নয়। অনুমানকে তদন্তের সিদ্ধান্তে পরিণত করা যাবে না; আবার প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেবে বিষয়টি যাচাইয়ের বাইরে রাখাও সমীচীন নয়।

আমাদের প্রত্যাশা, নৌ পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন সমন্বিতভাবে তদন্ত পরিচালনা করবে। সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য, সর্বশেষ কণ্ঠবার্তার সত্যতা, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন একসূত্রে বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রয়োজনে আধুনিক অপরাধতাত্ত্বিক পরীক্ষার সহায়তা নিতে হবে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে এবং কারও প্রতি আগাম দায় চাপানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পরিবারকে নিয়মিত অবহিত করা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ করাও জরুরি। প্রভাব, পরিচয় কিংবা পেশাগত অবস্থান যেন তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ করতে না পারে। একই সঙ্গে প্রমাণ নষ্ট, সাক্ষীকে প্রভাবিত করা কিংবা অপরাধীকে আড়াল করার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে।

তাহসিফের পরিবার একজন সন্তানকে হারিয়েছে; কিন্তু তাদের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা রাষ্ট্রের কাছেই। এই মৃত্যু দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড-তার চূড়ান্ত উত্তর আসতে হবে নির্ভুল তদন্ত ও অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে। সত্য উদ্ঘাটনে কোনো গাফিলতি, অযথা বিলম্ব কিংবা দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। একজন নাগরিকের মৃত্যুর রহস্য অমীমাংসিত রেখে নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবি অর্থহীন। তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।
সানা/আপ্র/৩০/১০/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই