গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

এলডিসি উত্তরণে তিন বছর সময়, অর্থনীতি সংস্কারের বড় পরীক্ষা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৫৩ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৪:০৩ এএম ২০২৬
এলডিসি উত্তরণে তিন বছর সময়, অর্থনীতি সংস্কারের বড় পরীক্ষা
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ছবিটি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে সংগৃহীত

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরো তিন বছর পিছিয়েছে জাতিসংঘ। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়সীমা পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ নেপাল। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হলেও এর মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সংকট বা কাঠামোগত দুর্বলতার অবসান ঘটবে না। বরং বাড়তি তিন বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতা যাচাই, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়।

নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্লেনারি সভায় কণ্ঠভোটে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান। ‘গ্রুপ অব ৭৭’ ও চীনের পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণ প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের পক্ষে কোনও দেশের আপত্তি বা বিরোধিতা আসেনি। ফ্রান্স, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা এ সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানান। তবে তাঁরা বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।

এই সিদ্ধান্তের ফলে ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকা বাংলাদেশের জন্য উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে আরো তিন বছর সময় তৈরি হলো। তবে এই সময়কে কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান সুবিধা ধরে রাখার অবকাশ হিসেবে দেখলে চলবে না। রফতানি আয় ও পণ্যের বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো কঠিন কাজগুলো এই সময়ের মধ্যেই এগিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় ২০২৯ সালে আনুষ্ঠানিক উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।

কূটনৈতিক অর্জনের পেছনে দীর্ঘ প্রক্রিয়া
এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পরদিনই ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে আরো তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ জানানো হয়। পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে ৬ এপ্রিল জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।

বাংলাদেশের আবেদনের বিষয়ে জাতিসংঘের উন্নয়ননীতি-সংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। গত ২ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ বাংলাদেশের উত্তরণ প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করে। ২০ অক্টোবর উরুগুয়ে ‘গ্রুপ অব ৭৭’ ও চীনের পক্ষে এ-সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করে। শেষ পর্যন্ত ২৯ অক্টোবর সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

বাংলাদেশের আবেদনের পেছনে ছিল দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা। কোভিড মহামারির কারণে আগেই উত্তরণের প্রস্তুতিকাল দুই বছর বাড়ানো হয়েছিল। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই সময়সীমা আরো তিন বছর বাড়ল।

তবে জাতিসংঘের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশকে সংস্কারের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বরং বাড়তি প্রস্তুতিকালে জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা, সংস্কারের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দেওয়া এবং উত্তরণকে টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রফতানি সুবিধা হারানোর আশঙ্কা ও প্রতিযোগিতার চাপ
বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তিন বছর পাওয়ার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য রফতানি বাণিজ্যে বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ ও বাণিজ্যিক জোটের বাজারে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পেয়ে আসছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধার বড় অংশ পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিকারকেরা ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্যিক জোটে এলডিসি-সংশ্লিষ্ট শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাচ্ছেন। দেশের মোট রফতানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এসব বিশেষ সুবিধার আওতায় রয়েছে। উত্তরণের পর সুবিধা হারালে বাংলাদেশের রফতানিতে গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের চাপ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার এক মূল্যায়নে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি আয় ১৭৫০ কোটি ডলারের বেশি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে। এসব হিসাবই বলে দিচ্ছে, বাড়তি সময়ের সদ্ব্যবহার না হলে দেশের রফতানি খাত কত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তাই এখন থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান রফতানি বাজারগুলোর সঙ্গে কার্যকর বাণিজ্য আলোচনা জোরদার করতে হবে। বিদ্যমান শুল্কসুবিধা যতটা সম্ভব ধরে রাখা, নতুন অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি করা এবং উত্তরণ-পরবর্তী বাজারপ্রবেশের শর্ত নিশ্চিত করতে হবে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তবে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি। ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি অন্য বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে চলমান আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।

তবে শুধু শুল্কসুবিধার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ মেয়াদে রফতানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রফতানি বাড়াতে হবে। পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা, নকশা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার মান নিয়ে যে কঠোরতা বাড়ছে, তা মোকাবিলায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই প্রস্তুত করতে হবে।

বিনিয়োগে স্থবিরতা, নতুন বাজারের সন্ধান
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের আধুনিকায়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, বাস্তবে তা নিশ্চিত হচ্ছে না। জাতিসংঘের মূল্যায়নসংক্রান্ত তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৫১০ কোটি ডলার থেকে কমে ২৮০ কোটি ডলারে নেমেছে। এটি বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও বাংলাদেশকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার দেখেন না; তাঁরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, জমির প্রাপ্যতা, বন্দরসুবিধা, পরিবহনব্যবস্থা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তাও বিবেচনা করেন। অথচ এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জটিলতা ও অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে রয়েছে। নতুন বিনিয়োগের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, জমি ও শিল্প অবকাঠামোর ব্যবস্থা করা, চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রচলিত রফতানি বাজারের বাইরে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার নতুন বাজারগুলোতে প্রবেশের উদ্যোগ নিতে হবে। বাজারভিত্তিক গবেষণা, পণ্যভিত্তিক রফতানি পরিকল্পনা, বাণিজ্য কূটনীতি এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত চাহিদা বুঝে উৎপাদন ও রফতানি পরিকল্পনা সাজাতে না পারলে নতুন বাজারের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাবে না।

ব্যাংক খাতের সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ বাড়বে না
অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা, অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের অভাব আর্থিক খাতের প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মূল্যায়নের বরাতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশে পৌঁছানোর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কার তাই আর্থিক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; এটি সরাসরি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রফতানি সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা জরুরি।

রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা। উন্নয়ন অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিকল্প নেই। অথচ মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় কর আদায়ের হার অত্যন্ত কম। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মূল্যায়নের বরাতে রাজস্ব আহরণ মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে কর রাজস্বের ৩৬ শতাংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

এ অবস্থায় করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। করদাতাদের হয়রানি কমিয়ে স্বেচ্ছায় কর দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে। এতে সঞ্চয় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, মজুতদারি ও কারসাজি নিয়ন্ত্রণ, আমদানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় এবং কার্যকর মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি গ্রহণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো না গেলে উৎপাদন ব্যয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় দুটোই বাড়বে, যা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কর্মসংস্থান বাড়ানো অপরিহার্য। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। জাতিসংঘের মূল্যায়নের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ১৯ লাখ কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাব নারীদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

শুধু শ্রমনির্ভর উৎপাদন দিয়ে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে কর্মবাজারের উপযোগী জনশক্তি তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, নতুন উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বিকাশে সহজ অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।

সুশাসন ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে
অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির অভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করে। ব্যবসা পরিচালনায় অনিশ্চয়তা বাড়লে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে নিরুৎসাহিত হন।

জাতিসংঘের মূল্যায়নে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কীভাবে বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে তাই বাড়তি প্রস্তুতিকালে অভ্যন্তরীণ সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এ ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার আওতায় কিছু বিশেষ নীতিগত সুবিধা ও ছাড়ের পরিবর্তন ঘটবে। বিশেষ করে রফতানি ভর্তুকি এবং মেধাস্বত্বসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন খাতকে এসব পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া সহজ শর্তের অর্থায়ন ও এলডিসি-নির্দিষ্ট সহায়তা ধীরে ধীরে কমে আসার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ফলে নিজস্ব রাজস্ব ও অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

ফাহমিদা খাতুনের পরামর্শ: সময়ভিত্তিক সংস্কার পরিকল্পনা
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। তবে একে স্বস্তির অবকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই অতিরিক্ত সময়কে অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করার প্রস্তুতি জোরদারে কাজে লাগাতে হবে।”

তিনি বলেন, এ জন্য প্রথমেই একটি বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। কোন সংস্কার কখন বাস্তবায়ন করা হবে, কোন প্রতিষ্ঠান এর দায়িত্বে থাকবে এবং অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সুবিধার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন আরো বলেন, একই সঙ্গে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মান উন্নয়ন করতে হবে। শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণেও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজারগুলোর সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে বিদ্যমান শুল্কসুবিধা ও সহজ শর্তে বাজারে প্রবেশের সুযোগ যতটা সম্ভব ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থায়নে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন। সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়লে দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

তাঁর মতে, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু এলডিসি উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়া নয়; বরং এমন অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে উত্তরণের পর বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, রফতানি প্রবৃদ্ধি ও মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

তিন বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জরুরি
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বাড়তি তিন বছরের জন্য একটি কার্যকর, সময়াবদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য সংস্কার কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। কোন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কোন দায়িত্ব পালন করবে, কত সময়ের মধ্যে কী লক্ষ্য অর্জন করতে হবে এবং অগ্রগতি কীভাবে পর্যালোচনা করা হবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন বা সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রতিটি খাতে বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথম বছরে ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ, রাজস্ব সংস্কারের সূচনা, বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং রফতানি বাজারগুলোর সঙ্গে আলোচনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে নতুন বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করা, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য তৈরি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ দৃশ্যমান করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশলের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

জাতিসংঘের সিদ্ধান্তেও বর্ধিত প্রস্তুতিকালে বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ কাজে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। উত্তরণ যেন দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উত্তরণ হতে হবে টেকসই ও অপরিবর্তনীয়।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য তিন বছর সময় পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। কিন্তু এই অর্জনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে আগামী দিনগুলোতে অর্থনৈতিক সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হলো, তার ওপর। রফতানি সুবিধা ধরে রাখা, নতুন বাজার তৈরি, বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, এলডিসি থেকে উত্তরণ কোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার চূড়ান্ত সনদ নয়; বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা। তাই তিন বছর পর বাংলাদেশ কেবল উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখাবে, নাকি শক্তিশালী উৎপাদনভিত্তি, বৈচিত্র্যময় রফতানি, সুসংহত আর্থিক খাত ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করবে, তা নির্ভর করছে এখনকার সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনার ওপর।

২০২৯ সাল বাংলাদেশের জন্য শুধু উত্তরণের নতুন তারিখ নয়, অর্থনীতির দুর্বলতা কাটিয়ে আত্মনির্ভর ও প্রতিযোগিতাসক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা। এই তিন বছর কাজে লাগাতে না পারলে সময় বাড়ানোর সুফল শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সানা/আপ্র/৩০/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

যাত্রাবাড়ীতে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল যুবকের
৩০ অক্টোবর ২০২৬

যাত্রাবাড়ীতে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল যুবকের

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে অজ্ঞাতপরিচয় একটি গাড়ির ধাক্কায় আরিয়ান (২৭) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। শুক্রবার...

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য, নদীর পাড়ে মিলল মোটরসাইকেল
৩০ অক্টোবর ২০২৬

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য, নদীর পাড়ে মিলল মোটরসাইকেল

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তুরাগ...

ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা, সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিলোমিটার
৩০ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা, সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিলোমিটার

সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার যথেচ্ছ চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন বিধিমালা...

বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার সম্মতি দেয়নি জাপান
৩০ অক্টোবর ২০২৬

বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার সম্মতি দেয়নি জাপান

বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে জাপান সরকার সম্মতি দিয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাম...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই