প্রায় এক যুগ আগে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে ‘গণহত্যার’ অভিযোগে দায়ের করা মামলায় পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল জলিল মণ্ডলকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একইসঙ্গে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৫ এপ্রিল দিন ঠিক করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মহিতুল হক এনাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেয়। দুপুরে আদালতের কাজ শুরু হলে কৌঁসুলি আব্দুস সাত্তার পালোয়ান ট্রাইব্যুনালকে জানান, মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৪ মে ১২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর অংশ হিসেবে সোমবার সন্ধ্যায় ২ নম্বর আসামি আবদুল জলিল মণ্ডলকে গ্রেফতার করা হয়।
পরে কাঠগড়ায় থাকা আসামির পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। আসামির ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, আব্দুল জলিল মণ্ডল এই মামলার প্রধান কুশীলব। তদন্তে উঠে এসেছে যে, তার সার্বিক পরিকল্পনাতেই এই ঘটনাগুলো ঘটেছে।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৫ এপ্রিলের মধ্যেই প্রতিবেদন ও ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ দাখিলের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। আসামিদের পরিচয় প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত যারাই জড়িত থাকুক, কেউ তদন্ত থেকে বাদ পড়বে না। শেখ হাসিনা ও বেনজীর আহমেদসহ এ মামলায় অনেক আসামি হবেন।
নিহতের পরিসংখ্যানের বিষয়ে তিনি বলেন, শাপলা চত্বরে এ পর্যন্ত ১৫-২০ জন নিহত হওয়ার তথ্য ও মৃত ব্যক্তিদের তালিকা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আরো অনুসন্ধান চলছে এবং আগামী শুনানির তারিখের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে।
গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে আবদুল জলিল মণ্ডলকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আবদুল জলিল মণ্ডল ২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। নারী উন্নয়ন নীতি ও শিক্ষা নীতির বিরোধিতা করে ২০১০ সালে গড়ে উঠেছিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। তবে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ আন্দোলনের পাল্টায় রাজপথে নেমে সংগঠনটি বেশি পরিচিতি পায়। শাহবাগের আন্দোলনের বিপরীতে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে সংগঠনটি। সেই সমাবেশ ঘিরে পুরো মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা আর তাণ্ডব চলে। পরে সেই রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের মতিঝিল থেকে সরানো হয়। শাপলা চত্বরের অভিযানে ৬১ জন নিহত হন বলে সে সময় এক প্রতিবেদনে দাবি করে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’। যদিও পুলিশের দাবি, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি, আর দিনভর সংঘাতে নিহতের সংখ্যাটি ১১। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ জমা পড়ে। শেখ হাসিনা ছাড়াও ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ, লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় সেখানে।
সানা/আপ্র/৩১/৩/২০২৬