রাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ সদর দপ্তরের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল বা টিএফআই সেল, যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত, পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতিরা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে আলোচিত এই স্থাপনা পরিদর্শন শেষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘আয়নাঘরের’ আলামত নষ্টের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শনিবার (১ আগস্ট) বিচারিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, তদন্ত কর্মকর্তা, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। শুধু নথি ও সাক্ষ্যের ওপর নয়, বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও বিচারিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, টিএফআই সেলে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষে ভুক্তভোগীদের মানবেতর পরিবেশে আটকে রাখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেককে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর সেখানে রাখা হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের কাছে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের কিছু চিত্রের মিল পাওয়া গেছে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সেখানে এমন কক্ষ রয়েছে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের শুয়ে থাকারও সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা, চোখ ও হাত বেঁধে রাখা এবং নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।’
তিনি জানান, গুমের অভিযোগে আলোচিত বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, সালাহউদ্দিন আহমদ এবং সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম ওরফে আরমানকে এই সেলে রাখা হয়েছিল বলে তথ্য রয়েছে। এখনো গুম হওয়া প্রায় আড়াই শতাধিক ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আলামত নষ্টের অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস: চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আয়নাঘরের’ অনেক আলামত নষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে নতুন স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে কিছু আলামত আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। দেয়াল সরানোর পর ২৯টি কক্ষ এবং নিচের কথিত ‘ডেথ সেল’-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, আলামত নষ্ট বা গোপনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তদন্তের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমিনুল ইসলাম আরো বলেন, আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা কিংবা পরিবারের কাছে তথ্য দেওয়ার বিধান মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা আইন ও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
‘টিএফআই নির্দিষ্ট কোনো স্থান নয়’: আসামিপক্ষ: তবে প্রসিকিউশনের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
র্যাবের সাত কর্মকর্তার পক্ষে আইনজীবী মো. তাবারক হোসেন বলেন, টিএফআই কোনো নির্দিষ্ট ভবন বা স্থান নয়; এটি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স। র্যাবের দায়িত্ব ছিল নির্ধারিত কাজের অংশ হিসেবে সহযোগিতা করা।
তিনি বলেন, সেখানে নির্যাতন হয়েছে কি না, সেটি আদালতে প্রমাণের বিষয়। আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাবারক হোসেন আরো বলেন, নিরাপত্তা ও প্রভোস্ট ইউনিটে অস্থায়ীভাবে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য এ ধরনের কক্ষ থাকতে পারে। তবে কাউকে কত সময় সেখানে রাখা হয়েছিল, তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, পরিদর্শন করা স্থানটিই কথিত ‘আয়নাঘর’ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এটি পরবর্তী সময়ে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মেসবাহ বলেন, কোনো ব্যক্তি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির না হলে তা আইনগত বিষয় হতে পারে; তবে সেটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে আইনি প্রমাণ প্রয়োজন।
ডিজিএফআইয়ের বন্দিশালা পরিদর্শন শনিবার: গত ২১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারিক স্বচ্ছতা ও বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ট্রাইব্যুনাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি দেন।
প্রধান প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, আগামী শনিবার ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কার্যালয়ে থাকা আরেকটি কথিত বন্দিশালা পরিদর্শন করা হবে।
টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার চলছে। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর এ মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
মামলার ১০ আসামি বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ সাব-জেলে রয়েছেন। বাকি সাত আসামি পলাতক রয়েছেন।
সানা/আপ্র/০১/৮/২০২৬