ক্যারিয়ারের অস্তাচলে পৌঁছে গিয়েছিলেন বেশ আগেই। এবার সেই অধ্যায়েরই পূর্ণ সমাপ্তি ঘোষণা করলেন হামেস রদ্রিগেস। ২০১৪ বিশ্বকাপের নায়ক, কলম্বিয়ার সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেওয়া এই তারকাকে আর দেখা যাবে না জাতীয় দলের জার্সিতে।
ক্লাব ফুটবলে সম্প্রতি ১৮ বছর পর নিজের দেশের ফুটবলে ফিরেছেন তিনি। তবে জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে দেখা যাবে না তাকে।
মঙ্গলবার নিজের সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টে বিদায়ের ঘোষণা দেন ৩৫ বছর বয়সী এই তারকা। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, আজ তিনি হৃদয় থেকেই সবার সঙ্গে কথা বলতে চান। বহু বছর, অসংখ্য ম্যাচ, আনন্দের মুহূর্ত ও কঠিন সময় পেরিয়ে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় শেষ করার সময় এসেছে—কলম্বিয়ার জাতীয় দলে তার এই দীর্ঘ যাত্রা। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে জাতীয় দলে প্রথম পা রাখেন তিনি।
অভিষেক ম্যাচেই বলিভিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে দলকে জেতানো গোল করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে নেন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে, দ্রুতই দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠেন এই তারকা।
ক্লাব ফুটবল ও জাতীয় দল—উভয় জায়গাতেই কখনো অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, কখনো আবার উইঙ্গার হিসেবে খেলতে দেখা গেছে এই সৃষ্টিশীল ফুটবলারকে। খ্যাতির শিখরে পৌঁছান তিনি ২০১৪ বিশ্বকাপে। কলম্বিয়াকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে নেওয়া সেই আসরে অসাধারণ ফুটবল খেলে গোটা বিশ্বের নজর কাড়েন তিনি। ওই আসরে পাঁচটি গোল করে জিতে নেন গোল্ডেন বুট এবং ম্যাচের পর ম্যাচ অসাধারণ পারফরম্যান্স মেলে ধরেন।
এছাড়া জায়গা করে নেন টুর্নামেন্টের সেরা একাদশেও। শেষ ষোলোয় উরুগুয়ের বিপক্ষে তার চোখধাঁধানো ভলির গোলটি শুধু দলকেই জেতায়নি, একই সঙ্গে সেই বিশ্বকাপের সেরা গোল হিসেবেও নির্বাচিত হয় সেটি। পরবর্তীতে ওই গোল জিতে নেয় সে বছরের ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ডও। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরপরই মোনাকো থেকে তাকে দলে টেনে নেয় ইউরোপের সফলতম ক্লাব রেয়াল মাদ্রিদ।
এরপর ২০১৮ ও ২০২৬ বিশ্বকাপেও অংশ নেন তিনি, যদিও ২০২২ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি কলম্বিয়া।
তার নেতৃত্বেই ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় ফাইনালে পৌঁছায় দলটি, যেখানে তারা হেরে যায় আর্জেন্টিনার কাছে। গত ৭ জুলাই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারে হারের সেই ম্যাচটিই হয়ে থাকছে তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সবমিলিয়ে দেশের জার্সিতে তিনি খেলেছেন ১৩১টি ম্যাচ, যা কলম্বিয়ার হয়ে একটি রেকর্ড।
তার করা ৩১টি গোল দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, আর তার ৪৩টি অ্যাসিস্ট দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দীর্ঘদিন ধরে কলম্বিয়ার ১০ নম্বর জার্সি পরার সম্মানও পেয়েছেন তিনি। বিদায়বেলায় তিনি বলেন, দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন ও গৌরবকে তিনি ধারণ করেছেন এই পুরো পথচলায়।
তিনি লেখেন, এই জার্সি গায়ে চাপানো ছিল তার কাছে একটি স্বপ্ন, আবার একই সঙ্গে একটি বিশাল দায়িত্বও। প্রতিবার মাঠে নামার সময় তিনি বুঝতেন, শুধু নিজের জন্য নয়, বরং তিনি খেলছেন তার পরিবার, সতীর্থ এবং লাখো কলম্বিয়াবাসীর জন্য, যারা তাদের সবার সঙ্গে একই স্বপ্ন দেখতেন।
তিনি আরও লেখেন, ১০ নম্বর জার্সি এবং অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরার সম্মান তার হয়েছিল, আর সেই সম্মান, দায়িত্ব এবং কলম্বিয়ার প্রতিনিধিত্ব করার প্রকৃত অর্থ বুঝেই তিনি সবসময় নিজের কাজটা করার চেষ্টা করেছেন। তার ভাষায়, ভালো দিন যেমন গেছে, তেমনি খুব কঠিন দিনও গেছে, তবে জার্সির জন্য গর্ববোধ করা তিনি কখনো থামাননি।
এখন শান্তভাবেই তিনি বিদায় নিচ্ছেন, কারণ সবসময় নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন তিনি। প্রতিটি মুহূর্তের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি কলম্বিয়াকে ধন্যবাদ জানান।
ক্লাব ফুটবলে পোর্তো, মোনাকো, রেয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ ও এভারটনের মতো ক্লাবে খেলা এই ফুটবলার গত কয়েক বছরে বেশ অস্থির সময় পার করে নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব মিনেসোটা ইউনাইটেড ছেড়ে কিছুদিন আগেই নাম লিখিয়েছেন নিজের দেশের ক্লাব আতলেতিকো নাসিওনালে। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে রেয়াল মাদ্রিদ অধ্যায় শেষ হওয়ার পর গত সাত মৌসুমে এটিই তার অষ্টম ক্লাব।
ডিসি/আপ্র/১৬/০৯/২০২৬